আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় বায়ুসেনার এক অবসরপ্রাপ্ত কর্তা ২০২৭ সালের জনগণনার জন্য সরকারের চালু করা 'স্ব-গণনা' (self-enumeration) পোর্টালে একটি মানচিত্র-সংক্রান্ত ত্রুটি তুলে ধরেছেন। ওই পোর্টালে অরুণাচল প্রদেশের 'পাসিঘাট' শহরটিকে ভুলবশত 'মেদোগ' হিসেবে দেখানো হয়েছে। যা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) ওপারে অবস্থিত একটি চীনা শহর। ওই প্রবীণ বায়ুসেনা কর্তার 'এক্স' প্ল্যাটফর্মে করা পোস্টটি বহু মানুষ শেয়ার করেছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, এটি চীনের কাছে "ভার্চুয়ালি" বা কার্যত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ারই নামান্তর।
অভিযোগটি সামনে আসার পর অনলাইনে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় যে - সমস্যাটি মানচিত্র পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার নজরে আনা হয়েছিল এবং ওই সন্ধ্যাতেই সমস্যাটির সমাধান করা হয়।
ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন যুদ্ধবিমান চালক ও লেখক মোহন্তো পাংগিং পাও শনিবার (১৮ এপ্রিল) বলেন, "স্ব-গণনা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সময় মানচিত্রগুলোতে অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব সিয়াং জেলার পাসিঘাট শহরটিকে 'মেদোগ' হিসেবে দেখানো হচ্ছিল!"
ভারত এই প্রথমবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনগণনা পরিচালনা করছে এবং এতে 'স্ব-গণনা'র বিশেষ সুবিধা যোগ করা হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনের জন্য চীনা সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে তাই এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য যে, চীন অরুণাচলের বেশ কিছু অংশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। তবে বেজিংয়ের এই দাবির কোনও ভিত্তি নেই।
ভারত সরকার, চীনের এ ধরনের প্রচেষ্টার বারবার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর চীনের যেকোনও দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারত এসব পদক্ষেপকে ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেছে। ভারত সরকার ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান জানিয়ে আসছে যে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। তাই সেখানকার কোনও জায়গার নাম পরিবর্তন বা নতুনভাবে শ্রেণীবদ্ধ করার কোনও প্রচেষ্টাই এই অমোঘ সত্যকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারবে না।
স্ব-গণনা পোর্টালে পাসিঘাটকে 'মেদোগ' হিসেবে প্রদর্শন
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহন্তো পাংগিং পাও (অবসরপ্রাপ্ত) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'X'-এ বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি এমন কিছু স্থানাঙ্ক (coordinates) শেয়ার করেন, যেখানে দেখা যায় যে স্ব-গণনা পোর্টালে পাসিঘাট এলাকাটিকে 'মেদোগ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাসিঘাট হল অরুণাচল প্রদেশের একটি শহর, আর মেদোগ অবস্থিত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলওসি-এর ওপারে, চীনে। ওই কর্মকর্তা জানান যে, পোর্টালে লগ-ইন করার দ্বিতীয় প্রচেষ্টার সময় তিনি এই ত্রুটিটি লক্ষ্য করেন এবং ভুল লেবেলটি দেখার পর তিনি আর স্ব-গণনার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারেননি।
"মেদোগ হল চীনের একটি শহর! গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই একজন ভারতীয়! এমনকি সরকারি পোর্টালগুলোও কার্যত আমাদের ভূখণ্ডকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে! এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন!"—'এক্স'-এ দেওয়া এক পোস্টে এমনটাই লিখেছেন মোহন্তো পাংগিং পাও।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন পাও এই ত্রুটিটি তুলে ধরার পর, 'এক্স'-এর বেশ কয়েকজন ব্যবহারকারী তাঁর পোস্টটি শেয়ার করেন। একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, "গুগলের পরিবর্তে তাদের 'MapMyIndia' ব্যবহার করা উচিত ছিল।"
অন্য এক ব্যবহারকারী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে ট্যাগ করে লেখেন, 'অনুগ্রহ করে নিশ্চিত করুন যেন কোনও সংস্থার দ্বারা যেন আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত না হয়। দয়া করে গুগলের ওপর কঠোর জরিমানা আরোপ করুন এবং জনগণনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।'
সরকারের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগ ও বিতর্কের মুখে, ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং জনগণনা কমিশনার 'এক্স' প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি স্বীকার করে নেন। তাঁরা নিশ্চিত করেন যে, পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় 'এক্স'-এ দেওয়া এক পোস্টে 'Census India 2027'-এর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে জানানো হয়, "আজ জনগণনা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্ব-গণনা প্রক্রিয়া চলাকালীন অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব সিয়াং জেলার পাসিঘাট এলাকার একটি মানচিত্র-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে একটি ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়। মানচিত্র পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছে।" উল্লেখ্য, এই অ্যাকাউন্টটি ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং জনগণনা কমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
ভারতের জনগণনা কমিশন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে কাজ করে। এই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং জনগণনা কমিশনার। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকে তাঁর কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
অনলাইনে অভিযোগটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনাহয়। তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে এই স্পষ্টীকরণটি দেওয়া হয়। জনগণনার স্ব-গণনা পোর্টালটি অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন এবং ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাগ করার জন্য গুগলের তৃতীয় পক্ষের ডিজিটাল মানচিত্র পরিষেবা ব্যবহার করে।
যদিও ২০২৭ সালের জনগণনা প্রথমবারের মতো ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, তবে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত গণনা কার্যক্রমগুলো ছিল সম্পূর্ণভাবে কাগজ-ভিত্তিক। ২০২৭ সালের জনগণনা দু'টি ধাপে সম্পন্ন হবে- ১লা এপ্রিল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত 'বাড়ি তালিকাভুক্তি কার্যক্রম', এবং এর পরপরই 'জনসংখ্যা গণনা' পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে।
















