আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা, দুটিতেই একটি শব্দ ঘুরে ফিরে এসেছে: ‘সংস্কার’ (Reforms)। সমীক্ষার প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, “আজ ভারত রিফর্ম এক্সপ্রেসে চেপে এগোচ্ছে।” কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এই ‘সংস্কার’ আসলে কী? এটি কি কোনও নির্দিষ্ট নীতিনির্ধারকের বিশ্বাসভিত্তিক সংকীর্ণ ধারণা, না কি এর কোনও বিস্তৃত সামাজিক-অর্থনৈতিক অর্থ রয়েছে?
অর্থনৈতিক সমীক্ষা যে সংস্কারগুলির কথা বলছে, তার তালিকা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ, প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI), বিদেশি বিনিয়োগে নিয়ন্ত্ৰণ শিথিল, লজিস্টিক্স আধুনিকীকরণ, কর সহজ করা, ডিজিটাল পরিকাঠামো বিস্তার, শ্রম আইন পরিবর্তন, স্কিলিং প্রকল্প, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসার ঢোকা ও বেরোনো সহজ করা। এগুলিকেই সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে এবং সম্ভাব্য জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে পৌঁছনোর দাবি করা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে কি এই সংস্কারগুলি ফল দিচ্ছে?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বারবার ভারতের জিডিপি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক (informal) ক্ষেত্রের তথ্য প্রায় অনুপস্থিত থাকায় প্রকৃত বৃদ্ধির ছবি বিকৃত হচ্ছে বলে তাদের বক্তব্য। সংগঠিত ক্ষেত্রের তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে গোটা অর্থনীতির মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অথচ অর্থনৈতিক সমীক্ষা এই গুরুতর প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। জিডিপি পরিমাপের ত্রুটি বা তথাকথিত সংস্কারের ফলে আদৌ দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধি হয়েছে কি না এ বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
সংস্কারের এত দাবির পরও উৎপাদন ক্ষেত্রের (manufacturing) জিডিপিতে অংশ কমে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ শতাংশে। PLI প্রকল্প চার বছর পেরিয়েও লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি, বরাদ্দ অর্থের মাত্র ১০ শতাংশ খরচ হয়েছে। স্কিলিং প্রকল্পগুলিও ব্যর্থ, কারণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না। কর্মসংস্থান (ELI) প্রকল্প ঘোষণা হলেও বাস্তবে তা কার্যত অচল। পরিস্থিতি ঢাকতে হাবিজাবি কাজ ও বিনা মজুরির শ্রমকে কর্মসংস্থান হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র সংজ্ঞার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দারিদ্র্য হ্রাসের যে দাবি করা হচ্ছে, তা মূলত NFHS তথ্যের ত্রুটিপূর্ণ তুলনার ওপর দাঁড়িয়ে। বাজেটে ঘোষিত করছাড় মূলত সংগঠিত ক্ষেত্র ও উচ্চবিত্তদের জন্য। আয়কর ছাড়ের সীমা ১২.৭৫ লক্ষ টাকা করায় জনসংখ্যার মাত্র ১–২ শতাংশ উপকৃত হবে। ৭ থেকে ১২ লক্ষ টাকার আয়ভুক্ত মধ্যবিত্তদের লাভ সামান্য। এর ফলে প্রত্যক্ষ কর আদায় প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ে।
জিএসটি হ্রাসেও মূল সুবিধা পাচ্ছে সংগঠিত ক্ষেত্র কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি জিএসটি দেয়। ফলে তাদের পণ্য সস্তা হচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের পণ্যের চাহিদা কমছে। এতে ভোগ বাড়তে পারে, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতের বিশাল কালো টাকার অর্থনীতিও যে কোনও সংস্কারের পথে বড় বাধা। প্রত্যক্ষ কর ও জিডিপির অনুপাত মাত্র ৬.৫ শতাংশ, বিশ্বের সর্বনিম্নগুলির একটি। এটি কেবল রাজস্ব ক্ষতি নয়, সম্ভাব্য বৃদ্ধির হারও কমিয়ে দেয়। অথচ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় এই বাস্তবতা উপেক্ষিত।
নতুন শ্রম কোড এবং মনরেগা কার্যত কৃষক ও সংগঠিত শ্রমিকদের সামান্য যে দরকষাকষির ক্ষমতা ছিল, সেটুকুও শেষ করবে। এই নীতিগুলি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন বাণিজ্য চাপের ফল, যারা ভারতীয় বাজারে প্রবেশ চায়। এর ফল হবে কৃষিপণ্যের দাম আরও কমে যাওয়া এবং অ-কৃষি উৎপাদকদের মুনাফা সংকোচন।
এই সংস্কারগুলি কেবল ব্যবসাবান্ধব নয়, স্পষ্টতই এলিটপন্থী। বিমানযাত্রা ও বিলাসবহুল ট্রেন প্রচার করা হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ গাদাগাদি করে ট্রেন ও বাসে যাতায়াত করছে। পাঁচটি ‘ইউনিভার্সিটি টাউন’-এর ঘোষণা আসলে বিভ্রান্তিকর কারণ বর্তমান শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই ক্রমশ দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হল সরকারের ক্রমবর্ধমান অগণতান্ত্রিক মনোভাব, RTI আইন শিথিল করার প্রস্তাব মানুষের নীতিনির্ধারণ পর্যবেক্ষণের অধিকার সংকুচিত করবে। শ্রমিকদের দোষারোপ করে শিল্প বন্ধ হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা সংবিধানে প্রতিশ্রুত জীবিকাযোগ্য মজুরির ধারণাকেই অস্বীকার করে।
পর্যটনকে কর্মসংস্থানের সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, অথচ এতে স্থানীয় সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ ও চাপ বাড়বে। একদিকে স্বদেশি ও আত্মনির্ভরতার কথা, অন্যদিকে অবাধ মুক্ত বাণিজ্যের প্রচার, দুর্বল গবেষণা ও উন্নয়ন কাঠামোর দেশে এর পরিণতি কী হতে পারে, অতীত অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ।
ভারতের আসল সমস্যা চাহিদার অভাব। তার সমাধান অসমতা কমানো, কিন্তু বাজেট ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। যারা ইতিমধ্যেই লাভবান, তারাই আরও পাচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পিছিয়েই পড়ছে। সংগঠিত ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পদ বণ্টন হচ্ছে, অথচ গুণগত কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশ্ন উপেক্ষিত। ফাটকা পুঁজিবাদের প্রসার বিনিয়োগ পরিবেশকেও নষ্ট করছে। রাষ্ট্র যখন পছন্দের ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়, বাকিরা নিরাপত্তাহীন বোধ করে। তাই বহু অতি-ধনী দেশ ছাড়ছেন, এটা কাকতালীয় নয়।
সত্যিকারের সংস্কার মানে সমান সুযোগ, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের ক্ষমতা বাড়ানো, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ এবং একটি সমতাভিত্তিক অর্থনীতি গড়া। কিন্তু বর্তমানে যা হচ্ছে, তা এক পক্ষপাতদুষ্ট খেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সুবিধাভোগীরা আরও সুবিধা আদায় করছে, আর প্রান্তিকরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যই তথাকথিত সংস্কারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
