আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: পাঞ্জাব কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের আবহে শনিবার চণ্ডীগড়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিং চান্নি-ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন পাঞ্জাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক ভূপেশ বাঘেল। প্রায় ৮০ মিনিটের বৈঠক শেষে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, দলের প্রতিটি নেতা নিজের বক্তব্য রাখার অধিকার রাখেন, কিন্তু হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। কেউ যদি দলীয় শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম করেন, তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাঘেলের এই মন্তব্যে স্পষ্ট, পাঞ্জাবে ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে আর বাড়তে দিতে চাইছে না কংগ্রেস নেতৃত্ব। এদিনই দিল্লি ফিরেছেন বাঘেল। শিগগিরই হাইকমান্ডকে তিনি রিপোর্ট পেশ করবেন। 

 

সম্প্রতি কংগ্রেস হাইকমান্ড অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিংকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চান্নিকে নির্বাচনী প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। এই সিদ্ধান্তে চান্নি শিবিরের একাংশ সন্তুষ্ট না হওয়ায় দলের অন্দরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। গত কয়েক দিনে বাঘেলের ডাকা একাধিক বৈঠকে চান্নির অনুপস্থিতি এবং তাঁর অনুগামীদের দূরত্ব সেই জল্পনাকে আরও উসকে দেয়। শনিবারের বৈঠক তাই কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং বিদ্রোহী শিবিরের ক্ষোভ প্রশমনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ বলেই মনে করা হচ্ছে। বৈঠকের পরে বাঘেল জানান, নেতাদের অভিযোগ ও মতামত তিনি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেবেন। তবে নেতৃত্ব পরিবর্তন বা রাজা ওয়ারিংকে সরানোর কোনও আলোচনা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, সরকার গঠন থেকে শুরু করে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতেও কংগ্রেস হাইকমান্ড নেবে। অর্থাৎ রাজ্য নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনার ইতি টানতেই চাইছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। 

 

এদিনের বৈঠকে উপস্থিত কংগ্রেস সাংসদ সুখজিন্দর সিং রণধাওয়ার মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারও নাম না করলেও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তিনি বলেন, পাঞ্জাবে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হলে আপসহীন ও সাহসী নেতৃত্ব দরকার, ‘আপসকামী’ নেতাদের নয়। তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই রাজা ওয়ারিংকে লক্ষ্য করেই করা ইঙ্গিত বলে ব্যাখ্যা করছেন। যদিও ওয়ারিং সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, যদি তাঁর নামই না নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তাঁকে লক্ষ্য করে মন্তব্য বলা হচ্ছে কেন? উল্টে তিনি দাবি করেন, দলে কোনও ‘বিজেপির স্লিপার সেল’ থাকা উচিত নয় এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে তিনি আশাবাদী, দলের অভ্যন্তরীণ মতভেদ খুব দ্রুত মিটে যাবে। একইকথা শোনা গিয়েছে ভূপেশ বাঘেলের মুখেও। তাঁর দাবি, ‘‌অল ইজ ওয়েল’। মুখে একথা বললেও চান্নি শিবিরের একাধিক নেতার বক্তব্য কিন্তু অন্য কথা বলছে। তাঁরা কার্যত শক্তিপ্রদর্শন করে বোঝাতে চাইছে, রাজা ওয়ারিংকে সরাতেই হবে। এখন বল হাইকমান্ডের কোর্টে। ‌

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাঞ্জাবে কংগ্রেস নেতাদের সংঘাত কেবল ব্যক্তিগত নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নয়; বরং ২০২৭ সালের পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ নিয়েও লড়াই। একদিকে চান্নি দলিত ভোটব্যাঙ্কের গুরুত্বপূর্ণ মুখ, অন্যদিকে রাজা ওয়ারিংকে রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ এবং সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে এই দুই শক্তিকেন্দ্রের ভারসাম্য বজায় রাখা কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দলীয় সূত্রের খবর, গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক বৈঠকের ভিত্তিতে ভূপেশ বাঘেল দু-‌একদিনের মধ্যেই কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেবেন। 

 

বিদেশ সফর শেষে রাহুল গান্ধী দেশে ফিরলে পাঞ্জাবের পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কংগ্রেসের অন্দরেই স্পষ্ট ইঙ্গিত, রাজা ওয়ারিংকে সরানোর কোনও পরিকল্পনা নেই। বরং নির্বাচনের আগে দলবিরোধী কার্যকলাপ বা প্রকাশ্য বিদ্রোহ বরদাস্ত করা হবে না। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে শাসক শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তোলা, অন্যদিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ ইতিহাস বলছে, পাঞ্জাবে কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বহু সময় বিরোধী দল নয়, বরং নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।