আজকাল ওয়েবডেস্ক: ছত্তীসগঢ়ের জেলব্যবস্থা নিয়ে তীব্র বিতর্কে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। গত ১৩ মাসে রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মোট ৬৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে—বিধানসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তরফে পেশ করা এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই তুমুল হইচই শুরু হয়। সংবাদমাধ্যম দ্যা হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি ঘিরে শাসক-বিরোধী সংঘাত চরমে ওঠে।

বিধানসভার প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা ভূপেশ বাঘেল গত ১৩ মাসে রাজ্যের জেলগুলিতে কতজনের হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে বলেন। তিনি জানতে চান, প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা National Human Rights Commission (এনএইচআরসি)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক বিচার বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে কি না। সাম্প্রতিক এক আদিবাসী নেতার হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় বলে জানা গেছে।

উত্তরে উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় শর্মা জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মোট ৬৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন—দুই ধরনের বন্দিই রয়েছেন। তিনি আরও জানান, হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক। সেই প্রক্রিয়া অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত ১৮টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, বাকি ঘটনাগুলিতে তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। এই জবাব প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধী শিবিরের সদস্যরা সরব হন।

ভূপেশ বাঘেল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, রাজ্যের জেলগুলিতে চরম ভিড়, স্বাস্থ্য পরিষেবার ভাঙন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিই এই মৃত্যুগুলির পেছনে বড় কারণ। তাঁর অভিযোগ, কারাগার ব্যবস্থা কার্যত চাপে ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে আদিবাসী নেতা জীবনের মৃত্যুকে ঘিরে তিনি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

&t=20s

আদিবাসী নেতা জীবন ঠাকুর গত ৪ ডিসেম্বর বিচারাধীন অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরকার পক্ষের দাবি অনুযায়ী, তাঁকে প্রথমে কাঁকেড় জেলা কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে রায়পুরের জেলে স্থানান্তর করা হয়। স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাঁকে রায়পুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে অবস্থিত রাজ্য পরিচালিত Dr. B.R. Ambedkar Memorial Hospital-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

উপমুখ্যমন্ত্রী জানান, নিয়ম মেনে তাঁর মৃত্যুর তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের দাবি, জীবনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়েছিল। ভূপেশ বাঘেলের অভিযোগ, জীবন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং জেলে থাকাকালীন তিনি সময়মতো ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসা পাননি। এমনকি চিকিৎসকদের পরামর্শ জেল সুপার উপেক্ষা করেছেন—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি জীবনের মৃত্যুর ঘটনায় বিধানসভার একটি কমিটির মাধ্যমে আলাদা তদন্তের দাবি তোলেন।

সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই আলাদা তদন্তের দাবি তোলা উচিত নয়। উপমুখ্যমন্ত্রী বলেন, আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষ হতে দেওয়াই শ্রেয়। এতেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। কংগ্রেস বিধায়করা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত একাধিক বিরোধী সদস্য ওয়াকআউট করেন।

রাজ্যের জেলগুলিতে এক বছরের মধ্যে ৬৬ জনের মৃত্যু নিছক পরিসংখ্যান নয়—এটি কারাব্যবস্থা, মানবাধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তের ফল কী দাঁড়ায়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা।