প্রতিদিন সকালে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির কাপে চুমুক না দিলে অনেকেরই দিন শুরু হয় না। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই পানীয়টি এখন কেবল একটি পানীয় নয়, বরং আভিজাত্য আর সতেজতার প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আজ যা আপনার তৃপ্তির কারণ, একসময় তার জন্যই হতে পারত জেল বা মৃত্যুদণ্ড। কফিকে এককালে 'শয়তানের পানীয়' বা 'বিদ্রোহের উসকানিদাতা' তকমা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বারবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। 'টেস্টিং টেবিল'-এর একটি প্রতিবেদন থেকে উঠে এসেছে কফি নিয়ে রাজনীতির সেই অজানা ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
2
6
কফি নিষিদ্ধ করার প্রথম বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৫১১ সালে মক্কায়। তৎকালীন শাসকরা মনে করতেন, কফি পানে মানুষের মনে স্বাধীন চিন্তার উদয় হয়। কফি হাউসগুলোতে জড়ো হয়ে মানুষ প্রশাসনের সমালোচনা এবং বিদ্রোহের পরিকল্পনা করতে পারে—এমন ভয়েই সেখানে কফি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে কফিপ্রেমীদের তীব্র প্রতিবাদে সেই নিষেধাজ্ঞা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
3
6
ইউরোপেও কফির পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৬শ শতাব্দীতে যখন প্রথম কফি ইতালিতে পৌঁছায়, তখন অনেক ধর্মযাজক একে 'খ্রিস্টানবিরোধী' বলে ঘোষণা করেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, যেহেতু মুসলিমরা কফি খায়, তাই এটি কোনওভাবেই খ্রিস্টানদের জন্য উপযুক্ত নয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে, পোপ অষ্টম ক্লিমেন্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তিনি নিজে কফি চেখে দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে রসিকতা করে বলেছিলেন, "এই পানীয়টি এতটাই সুস্বাদু যে একে কেবল কাফেরদের জন্য ছেড়ে দেওয়াটা হবে পাপ।" এরপর থেকেই ইউরোপে কফি বৈধতা পায়।
4
6
কফির বিরুদ্ধে সবচেয়ে অদ্ভুত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন প্রুশিয়ার (বর্তমান জার্মানি) রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট। ১৭৭৭ সালে তিনি একটি ইশতেহার জারি করে বলেন, কফির বদলে মানুষের বিয়ার পান করা উচিত। তার যুক্তি ছিল, কফি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় যা দেশের অর্থনীতিতে টান ফেলে, অথচ বিয়ার দেশে উৎপাদিত হয়। তিনি এমনকি 'কফি স্নিফার' বা ঘ্রাণশিকারী বাহিনী নিয়োগ করেছিলেন, যাদের কাজ ছিল রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কোথাও অবৈধভাবে কফি ভাজা হচ্ছে কি না তা গন্ধ শুঁকে বের করা।
5
6
সুইডেনেও কফি নিয়ে চলেছে দীর্ঘ সংঘাত। রাজা তৃতীয় গুস্তাভ বিশ্বাস করতেন কফি স্বাস্থ্যের জন্য বিষ। তিনি এমনকি দুই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন—একজনকে প্রতিদিন প্রচুর কফি এবং অন্যজনকে চা পান করানো হতো। দেখা গেল, যিনি কফি খাচ্ছিলেন তিনি চা পানকারীর চেয়ে অনেক বেশিদিন বেঁচে ছিলেন। তবুও সুইডেনে কয়েক দফায় কফি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং মানুষের কফি খাওয়ার সরঞ্জাম পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা হতো।
6
6
আজকের দিনে স্টারবাকস বা ক্যাফে কফি ডে-তে বসে যখন আমরা আড্ডা দিই, তখন কল্পনা করাও কঠিন যে এই সাধারণ পানীয়টির জন্য একসময় মানুষকে শাসকদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, নিষিদ্ধ করার চেষ্টা বারবার হলেও কফির মন মাতানো স্বাদ আর গন্ধের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে ক্ষমতাশালী সম্রাট থেকে শুরু করে কট্টরপন্থী ধর্মগুরুরা।