সমুদ্রের বুকে যখন কোনও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দানা বাঁধে, তখন টেলিভিশন কিংবা খবরের কাগজের পাতায় আম্পান, তিতলি, রিমাল বা ইয়াসের মতো নানা বিচিত্র নামের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। তবে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপকে কেন এবং কীভাবে মানুষের দেওয়া নামে চিহ্নিত করা হয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
2
7
মূলত আবহাওয়াবিদ, দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সঠিক ও দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই নামকরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সময়ে একাধিক ঝড় সক্রিয় থাকলে কেবল অক্ষাংশ বা দ্রাঘিমাংশের খটমট সংখ্যার চেয়ে একটি সহজ নাম ব্যবহার করলে কোনও বিভ্রান্তি তৈরি হয় না এবং সতর্কবার্তা প্রচার করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
3
7
বিশ্বজুড়ে এই নামকরণের পুরো বিষয়টি পরিচালনা করে জাতিসংঘের আওতাধীন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও (WMO)। বিভিন্ন মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা আলাদা আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের দায়িত্ব পালন করে ভারতের মৌসম ভবন বা ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD)।
4
7
ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মালদ্বীপ, ওমান, থাইল্যান্ড, ইরান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইয়েমেন—এই ১৩টি সদস্য দেশ আগে থেকেই প্রস্তাবিত নামের তালিকা তৈরি করে জমা দেয়। দেশগুলির ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে সেই তালিকা সাজানো থাকে এবং নতুন কোনও ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে পর্যায়ক্রমে একটি করে নাম বেছে নেওয়া হয়।
5
7
তবে যেকোনও ঝড় উঠলেই তার কপালে নাম জোটে না। এর জন্য আবহাওয়া বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কিছু মাপকাঠি পার হতে হয়। কোনও নিম্নচাপের রূপরেখা সুনির্দিষ্ট হয়ে যখন বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় অন্তত ৬২ কিলোমিটার বা ৩৪ নটিক্যাল মাইলে পৌঁছায়, কেবল তখনই সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনিক স্টর্মের মর্যাদা পায় এবং তালিকার পরবর্তী নামটি দেওয়া হয়। একই ধরনের ঝড় পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে হ্যারিকেন বা টাইফুন নামে পরিচিত হলেও নীতিগতভাবে নামকরণের প্রক্রিয়াটি সর্বত্রই প্রায় এক।
6
7
নাম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। নামগুলো হতে হয় সংক্ষিপ্ত, যাতে উচ্চারণে কোনও জটিলতা না থাকে এবং সাধারণভাবে তা সর্বোচ্চ আটটি অক্ষরের মধ্যে সীমিত রাখতে বলা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই নামগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়; কোনও ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমন কোনও শব্দ রাখা একেবারেই নিষিদ্ধ।
7
7
এছাড়া কোনো ঘূর্ণিঝড় যদি কোনও অঞ্চলে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে মানুষের আবেগ ও অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি বিবেচনা করে সেই নির্দিষ্ট নামটি তালিকা থেকে চিরতরে বাদ বা ‘অবসর’ দেওয়া হয় এবং তার জায়গায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিজ্ঞানের এই অনন্য সমন্বয়ের ফলেই সাগরে ঘূর্ণি দেখা দিলে খুব সহজেই তা চিনে নেওয়া সম্ভব হয়।