শ্যামা, আদ্যাশক্তি কালীরূপের মধ্যে ভয়ংকর এবং স্নেয়ময়ী রূপের অদ্ভুত মিশেল৷ এক হাতে অসুরের ছিন্নমুণ্ড, অন্য হাতে খড়্গ, গলায় মুণ্ডমালা, কোমরে নরমুণ্ডের মালা। তাঁর জিহ্বা প্রসারিত, চোখে তেজ, আর পায়ের নীচে শায়িত স্বয়ং মহাদেব। কালীমূর্তির এই রূপ বাঙালির কাছে অত্যন্ত পরিচিত।
2
11
হিন্দুধর্মে কালী সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের শক্তি। 'কাল' শব্দের সঙ্গে তাঁর নামের যোগ রয়েছে। কাল অর্থ সময়। যিনি সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন, যিনি সময়েরও অতীত, তিনিই কালী।
3
11
দেবীর গায়ের কালো রং অসীমতা, মহাশূন্য এবং সমস্ত রূপকে নিজের মধ্যে ধারণ করার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।
4
11
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অসুর রক্তবীজের সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধের সময় এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। রক্তবীজের শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই সেই রক্ত থেকে জন্ম নিত আরও এক রক্তবীজ
5
11
ফলে যতবার তাকে আঘাত করা হচ্ছিল, ততবারই অসুরের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে দেবী দুর্গার কপাল থেকে আবির্ভূত হন ভয়ংকরী কালী। তিনি রক্তবীজকে আক্রমণ করেন এবং তার শরীর থেকে রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করতে থাকেন। এভাবেই রক্তবীজের বংশবিস্তার বন্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার বিনাশ ঘটে।
6
11
কিন্তু অসুরবধের পরেও দেবীর ক্রোধ প্রশমিত হচ্ছিল না। যুদ্ধের উন্মত্ততায় তিনি ধ্বংসের নৃত্য শুরু করেন। উগ্ররূপা কালীকে শান্ত করতে দেবতারা শিবের শরণাপন্ন হন। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, দেবীকে শান্ত করার জন্য শিব যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদেহের মধ্যে নিজেকে শুইয়ে দেন।
7
11
উন্মত্ত অবস্থায় নৃত্য করতে করতে কালী যখন শিবের বুকে পা রাখেন, তখন তাঁর সম্বিত ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন, নিজের পা রেখেছেন স্বয়ং মহাদেবের বুকে। লজ্জা ও বিস্ময়ে বেরিয়ে আসে তাঁর জিহ্বা। সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায় দেবীর ধ্বংসলীলা।
8
11
শিব এবং শক্তি একে অপরের পরিপূরক। শিব হলেন চৈতন্য বা পরম সত্তার প্রতীক, আর কালী হলেন সেই চৈতন্যের সক্রিয় শক্তি। শক্তি ছাড়া শিব নিষ্ক্রিয়, আবার শিব ছাড়া শক্তির প্রকাশ অসম্পূর্ণ।
9
11
অর্থাৎ সৃষ্টি ও ধ্বংসের জন্য এই দুই শক্তির মিলন অপরিহার্য। কালী শিবের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন—এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে শিব ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়।
10
11
দেবীর গলায় মুণ্ডমালা, হাতে খড়্গ এবং নরমুণ্ডও প্রতীকী অর্থ বহন করে। মুণ্ডমালা মানুষের অহংকার ও নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। খড়্গ অজ্ঞানতা ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক।
11
11
অন্যদিকে তাঁর অভয় ও বরদানের মুদ্রা ভক্তকে আশ্বাস দেয়। কালীর ভয়ংকর রূপ আসলে অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। আর শিবের বুকে তাঁর অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, সৃষ্টি ও শক্তির মধ্যে কোনও বিচ্ছেদ নেই। ধ্বংসের মধ্য দিয়েও নতুন সৃষ্টির পথ তৈরি হয়।