মেঘলা আকাশ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ছোঁয়ায় শহর কলকাতা যেন এক লহমায় বদলে যায় চেনা কবিতার ছন্দে। ভেজা রাজপথ, কাচের জানলায় জলের ফোঁটা আর ট্রাফিকের চেনা কোলাহলের মাঝেই বাতাসে ভেসে আসতে শুরু করে কড়া পাকের সর্ষের তেল আর বেসনের ম ম ঘ্রাণ।
2
7
আবহাওয়া দপ্তর যখন টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়, তখন গৃহবন্দি বাঙালির মন আর ডায়েটের কড়া শাসনে আটকে থাকতে চায় না। তখন খিচুড়ির থালার পাশে আলুর চপ, মুচমুচে বেগুনি, ফুলুরি আর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ আদা চা—এই হয়ে ওঠে তিলোত্তমার সবচেয়ে আদিম ও অকৃত্রিম রোমান্স।
3
7
গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজারের মোড়, কিংবা সল্টলেকের কাচের দেওয়াল ঘেরা সেক্টর ফাইভ—আকাশে মেঘের গর্জন শুনলেই ছোট-বড় সব তেলেভাজার দোকানে লম্বা লাইন পড়ে যায়।
4
7
আইটি কর্মীর ডেস্কটপ হোক কিংবা মধ্যবিত্তের বৈঠকখানা, বৃষ্টির শব্দে ‘রিমঝিম গিরে সাওন’-এর সুরের সঙ্গে বেগুনি আর পেঁয়াজির কামড় যেন এক অবধারিত সংস্কৃতি। খাদ্যরসিক বাঙালির পাকযন্ত্র নিয়েও তো রসিকতার শেষ নেই।
5
7
যে জাতি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য থেকে শুরু করে ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব অনায়াসে আত্মস্থ করে ফেলে, কিংবা চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতি ও ইউরোপের মন্দা নিমেষে হজম করে নেয়, তাদের কাছে ফুটন্ত তেলের এই রসদ তো অতি সাধারণ বিষয়। শরীর সচেতনরা যতই কোলেস্টেরলের চোখরাঙানি দেখান না কেন, বৃষ্টির দিনে বাঙালির কাছে তেলেভাজা কোনো সাধারণ খাবার নয়, এক ধরনের উদযাপনের নাম।
6
7
এই মুচমুচে অভ্যাসের শিকড় কিন্তু জড়িয়ে রয়েছে খোদ শহরের ইতিহাসের সঙ্গেও। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বরাহনগরের ফাগুলাল শাহের দোকানের তেলেভাজা প্রীতির কথা যেমন সুবিদিত, তেমনই উত্তর কলকাতার বিধান সরণির খেদুর দোকানের তেলেভাজার পরম ভক্ত ছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু। সেই ভালোবাসার সূত্র ধরেই তো পরবর্তীকালে ওই দোকানের পরিচয় দাঁড়িয়ে যায় ‘নেতাজির তেলেভাজা’ নামে।
7
7
সময়ের সঙ্গে কলকাতার ভৌগোলিক মানচিত্র বদলেছে, জীবনযাত্রার গতি বেড়েছে, কিন্তু বৃষ্টিভেজা দিনে কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলে বেগুনি ভেসে ওঠার শব্দ আর কাগজের ঠোঙায় ধরা গরম আলুর চপের প্রতি বাঙালির এই টান আজও একফোঁটাও বদলায়নি। স্যাঁতসেঁতে মেঘলা দিনে শহরকে নতুন করে ভালোবাসতে এই একটুকরো মুচমুচে আশ্রয়টুকুই হয়তো আজও যথেষ্ট।