বর্তমানে বলিউড ঝলমলে, তারকা-কেন্দ্রিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। তবে এই ছবিটা কিন্তু প্রথম থেকে ছিল না। বিশেষ করে পাঁচ ও ছয়ের দশকে হিন্দি ছবির ভাগ্য নির্ধারণ করত অন্য এক শক্তি -ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটররা। রাজেশ খান্নার জীবনী থেকে নেওয়া একটি অংশ সেই সময়ের বাস্তবতা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। তখন ছবির কয়েক রিল দেখেই ডিস্ট্রিবিউটররা বড়সড় পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারতেন। কখনও কখনও সেই সিদ্ধান্তই হয়ে উঠত কোনও অভিনেতার কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট অথবা শেষ অধ্যায়!
বিশেষ করে নতুন মুখদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব ছিল মারাত্মক। ‘আরাধনা’ ছবির আগে প্রায় অপরিচিত রাজেশ খান্না ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গৌতম চিন্তামণির লেখা রাজেশ খান্নার জীবনী ডার্ক স্টার: দ্য লোনলিনেস অব বিইং রাজেশ খান্না-তে উল্লেখ করা হয়েছে, বহু ছবির ক্ষেত্রেই প্রথম ও সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটররা। আর রাজেশ খান্নার মতো তখনও প্রতিষ্ঠা না পাওয়া অভিনেতাদের জন্য সেই বাধা হয়ে উঠতে পারত চূড়ান্ত অন্তরায়।
তবে ১৯৬৯ সালের আরাধনা নিয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ ইতিবাচক। সেই বই অনুযায়ী, আরাধনা ছবির গান ও সামগ্রিক নির্মাণশৈলী তাঁদের মুগ্ধ করেছিল, এমনকী রাজেশ খান্নাকেও তাঁরা পুরোপুরি বাতিল করেননি। কিন্তু একটি জায়গায় আপত্তি ছিল প্রবল-ছবিতে রাজেশ খান্না যেখানে শর্মিলার ছেলের চরিত্রে অভিনয় করাকালীন তাঁককে ‘মা’ বলে সম্বোধন করছেন। ছবির ওই অংশটি দেখে পরিবেশক গোষ্ঠী এতটাই অস্বস্তিতে ছিলেন যে, পরিচালক শক্তি সামন্তকে সেই অংশ নতুন করে শুট করার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থও প্রস্তাব করেন। এমনকী রাজেশ খান্নার ছেলের চরিত্রটি অন্য কোনও অভিনেতাকে দিয়ে করানোর প্রস্তাবও ওঠে।
কিন্তু শক্তি সামন্ত অনড় ছিলেন। জীবনী অনুযায়ী, তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েননি। শেষ পর্যন্ত ডিস্ট্রিবিউটরদেরই পিছু হটতে হয়, আর শক্তি সামন্তের সেই সিদ্ধান্তই পরে ইতিহাস গড়ে।
আজকের মতো একসঙ্গে সারা দেশে মুক্তি নয়, ‘আরাধনা’ প্রথম মুক্তি পেয়েছিল দিল্লিতে, বম্বেতে মুক্তি পাওয়ার এক সপ্তাহ আগে। সেই আগাম মুক্তিই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিল। দিল্লির প্রথম শো চলাকালীনই রাজেশ খান্না বদলে যান, এক সম্ভাবনাময় নতুন মুখ থেকে হয়ে ওঠেন বলিউডের সুপারস্টার। শো শেষ হতেই প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত সবাই তাঁকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন।
বম্বেতে ছবি পৌঁছনোর আগেই ‘আরাধনা’ হয়ে যায় সুপারহিট। বক্স অফিসের সামনে আধ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন তখন নিত্যদিনের দৃশ্য। শুধু তাই নয়, মাদ্রাজ ও বেঙ্গালুরুর মতো নন-হিন্দিভাষী শহরেও ছবিটি টানা ১০০ সপ্তাহ চলেছিল, যা সেই সময়ে ছিল বিরল কৃতিত্ব।
বইটি আরও ব্যাখ্যা করে কেন ‘আরাধনা’ দর্শকের হৃদয়ে এত গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। রোমান্টিক দৃশ্য ও সুরেলা গানে রাজেশ খান্না আগেও নজর কাড়লেও, এই ছবিতে সেই শক্তিকেই পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছিল। ‘আরাধনা’ আদতে ছিল এক পরিণত প্রেমের গল্প, যেখানে তাড়াহুড়ো নেই, বরং অভিনেতাকে নিজেকে মেলে ধরার সময় দেওয়া হয়েছে।
ফলাফল? মুহূর্তেই জন্ম নেয় এক নতুন তারকা। জীবনীটি খুব সহজ ভাষায় সেই সাফল্যের সারমর্ম টেনে বলে, নারী দর্শকেরা এক ঝলকেই তাঁর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। রাজেশ খান্নার উত্থান তখন আর থামানোর মতো কোনও রাশ ছিল না।
