নতুন বছরের শুরু। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে উদ্‌যাপনে মেতেছেন বহু মানুষ। বিভিন্ন প্রান্তে দেদার খানাপিনা, নাচগান চলেছে। তার সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন অর্থাৎ নতুন বছরে কী করবেন আর কী করবেন না এরকম হরেক রঙিন একগুচ্ছ পরিকল্পনা। বিগত প্রজন্মের জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কি এহেন আবহে নয়া পরিকল্পনা নেন আজও? নিলে ঠিক কী কী হয়ে সেই পরিকল্পনা? আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নিয়ে আলোচনা করলেন কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, লাবণী সরকার, অর্জুন চক্রবর্তী এবং শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। 


 নতুন বছরের শুরুটা বাড়িতেই কাটাচ্ছেন কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শীতের নরম রোদের মৌতাত নিয়ে ঘরেই গান-সিনেমার মধ্যে বছরের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন-এর কথা উঠতেই তিনি সটান জানিয়ে দিলেন সেভাবে কখনওই প্রতি বছরের শুরুতে তিনি রেজোলিউশন বিষয়টি মানেননি। বরং কিছু রেজোলিউশন আছে যা সারা জীবন তিনি মেনে চলেন। বর্ষীয়ান অভিনেতার কথায়, “আমার সারা জীবনের কিছু রেজোলিউশন আছে। সৎভাবে জীবনযাপন করা, যাঁরা আমার উপর নির্ভরশীল তাঁদের যত্ন করা। এবং অবশ্যই কুকথায় কর্ণপাত না করে নিজের কাজটুকু আরও মন দিয়ে করে যাওয়া। একই সঙ্গে চেষ্টা করি যতটা সম্ভব বিনয়ী হয়ে, ভদ্র থাকা লোকসমাজে।” সামান্য থেমে তিনি আরও জোড়েন, “আর অভিনয়ের পাশাপাশি গান আমার জীবনে জড়িয়ে আছে ভীষণভাবে। সারাদিন কাজের পর যেটুকু সময় পাই গান-সিনেমার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি। কারণ, আমার মতে, পরনিন্দা করার অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কাজ। যাই হোক, প্রেক্ষাগৃহে ঘনঘন গিয়ে উঠতে পারি না যেহেতু প্রায় প্রতিদিন অনেকটা সময় জুড়ে ধারাবাহিকের শুটিং থাকে। তবে সারা সপ্তাহে কিন্তু আমি তিনটি থেকে চারটি সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজ নিয়ম করে দেখি ওটিটি-তে। দেখবই! এটা আমার প্রতি সপ্তাহের রেজোলিউশন বলতে পারেন।” দরাজ গলায় হাসতে হাসতে বলে উঠলেন তিনি। 

 

লাবণী সরকার নিজস্ব ছন্দে বলে উঠলেন, “দেখুন, ক্যালেন্ডার, নতুন বছরের হিসেবে তো আমরা মানুষেরা নিজের স্বার্থে নিয়ম হিসেবে ঠিক করেছি এবং সেই হিসেব মেনে চলি। এটি না থাকলে প্রতিটি দিন-ই তো আনকোরা নতুন। খালি চোখে এক দিনের সঙ্গে আরেক দিনের তফাৎ কী?  তাই, কোনওকালেই নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন আমার নেওয়া হয়ে ওঠেনি। জানিয়ে রাখি, আমি কিন্তু প্রতিদিন-ই নিজস্ব রেজোলিউশন নিই। কী সেগুলো? প্রকৃতির যতটা কাছে থাকা যায়, সেখান থেকে পজিটিভ ভাইবস নেওয়া, যে যে ভুলগুলো করেছি আজকে সেগুলো যেন আগামীকাল করব না, কোন ব্যাপারে রেগে যাচ্ছি সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া, নিজের চিন্তাভাবনাগুলো বাস্তবায়িত করার চেষ্টা প্রতিদিন...এই ব্যাপারগুলো প্রতিদিন নিয়ম করে মেনে চলার চেষ্টা করি। আর হ্যাঁ, প্রতিদিন আমি কোনও না কোনও পজিটিভ উক্তি পড়ি- বাংলা অথবা ইংরেজিতে।”  

 

নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজিত ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড ছবির মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর বড়পর্দায় কামব্যাক করছেন অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে নিজেই সেই ঘোষণা করেছেন শিবপ্রসাদ। শোনা যাচ্ছে, নতুন বছরের প্রথম মাসেই শুটিং শুরু হতে পারে এ ছবির। ফলে বর্ষীয়ান অভিনেতার যে ভারী ব্যস্ততার মধ্যেই শুরু হবে চলতি মাস তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নিয়ে তাঁর সহজ, খোলামেলা মন্তব্য, “ছোটবেলা থেকে কখনওই নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন সেভাবে কখনওই পালন করা হয়নি। মানে, বাবা-দাদু ডাক্তার হওয়া সত্বেও খুবই সাধারণভাবে বেড়ে ওঠা আমার। আমার মতে, রেজোলিউশন  তাঁরা করে যাঁরা অন্যভাবে বড় হয়েছেন...মানে ধরুন এইরকম কাজ করে অস্বস্তি হচ্ছে, মনে হচ্ছে ভুল করেছি সুতরাং আর করব না এসব কাজ -এসব জায়গা থেকেই রেজোলিউশন নেওয়া হয়। আমার জীবনে এমন কিছু হয়নি যাতে মনে হয়েছে আর করব না।” হাসতে হাসতে বলে উঠলেন তিনি।

সামান্য থেমে তিনি অবশ্য যোগ করলেন, “তবে হ্যাঁ, এমন কিছু করা হয়ে ওঠেনি বা করব করব করছি সেটা এইবেলা করে ফেলব, সেরকম কিছু ইচ্ছে অবশ্যই আছে আমার। যেমন ধরুন, কারও সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে ফেলেছি, কোনও চেনা মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারেনি...সেগুলো শোধরানোর চেষ্টা করব। আরও আছে। ধরুন, বাড়িতে বেশ কিছু নতুন কেনা বই পরে আছে, সেগুলো ঝটপট পড়া শুরু করতে হবে, এখনও কত ভাল ভাল আন্তর্জাতিক মানের ছবি দেখা বাকি, সেগুলো দেখে ফেলতে হবে সময় করে। অনেকদিন রাজস্থান যাওয়া হয়নি, রাজস্থানে আমার পূর্বপুরুষের আদি বাড়ি। সেখানে গিয়ে একটু সময় কাটাব এই বছর। আমার ক্লাস টু-এর চারজন বন্ধু ছিল...দু’জন মারা গিয়েছেন আর বাকি দু’জন বেঁচে রয়েছেন। সেই বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা মারব, গল্প-হাসি ভাগ করব এই বছরেই।”

 

শুভাশিস মুখোপাধ্যায় ধরা দিলেন সেই অতি পরিচিত ছন্দেই। ঠান্ডা এবং বিন্দাস মেজাজেই। রাখলেন একগুচ্ছ প্রশ্ন –“এই নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন-এর বিষয়টা না কোনওদিনও আমার মাথায় ঢুকল না। অনেকেই তো এটা নেয়, রাখতে পারে ক'জন? তার উপর নতুন বছরের শুরুতে  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নিলে বাকি বছরে কি নেওয়া যাবে না? কারণ প্রতিদিন-ই তো আমাদের লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে। নতুন নতুন শিক্ষা দিচ্ছে জীবন, সেসব অনুভব করার পর রেজোলিউশন তো বদলে যাবেই। অন্তত বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আরও আছে, দাঁড়ান। ১ জানুয়ারি  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নিলে ১লা বৈশাখেও আমরা  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নেব না কেন?  জানুয়ারিতে নেওয়াটা ইংরেজরা চালু করেছিল বলে নাকি? আচ্ছা, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, বাংলা নববর্ষেও  নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন নেব, তাহলে এতগুলো প্রতিজ্ঞা রাখতে পারব তো নাকি হিমশিম খাবো? আপনিই বলুন।” 

 

“আমি যা করি, মুহূর্তে বাঁচি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। অবশ্যই নিজের কিছু মূল্যবোধ রয়েছে যা পারিবারিক শিক্ষা, চেতনা এবং জীবনের শিক্ষা থেকে পাওয়া, সেগুলো থেকে টলে যাই না। সেসবের উপর ভিত্তি করেই যাপন করি জীবন।” এরপর কথাশেষে অবশ্য নতুন বছরে সকলের জন্য সাফল্য এবং আনন্দ কামনা করলেন তিনি।

 

 

 

ক্যালেন্ডার বলুক নতুন বছর, কিন্তু অভিজ্ঞতার ভাষায় খাতা খোলে প্রতিদিন। তাই নিউ ইয়ার রেজোলিউশন থাক বা না থাক, বাঁচার ভাল অভ্যাসটা থাকলেই জীবন সুন্দর…আর বাকিটা সময়ই শিখিয়ে দেয়।