২৬ অগস্ট কিংবদন্তি বাঙালি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে এদিন তাঁর বয়স হত ১০৫। বিশ্বাস করতেন, তাঁর বাঙাল সংলাপ, বাঙাল বুলির লব্জে নয়, স্রেফ তাঁর অভিনয় দেখেই হাসতেন দর্শক। উচ্চশিক্ষিত তো ছিলেনই পাশাপাশি নিয়মিত হলিউডের ছবি দেখতেন। তাঁর ‘ভানুদা’ সম্বন্ধে কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিজীবনেও কৌতুকপ্রিয় একজন সহজ সরল মানুষ ছিলেন। তবে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বললে শুধুই একটা হাসাবার যন্ত্র মনে পড়ে না। বরং একটা জীবনধারণা জীবন সম্পর্কে একটা মন্তব্য যেন মনকে ছুঁয়ে যায়। আর নিজের অভিনয় শৈলী দিয়ে এই জীবন ভাবনাকে যেভাবে প্রকাশ করেছেন ভানুদা সেটা ঘোর বাঙালি। আর এটাই ওঁর দর্শক হিসাবে সবথেকে তৃপ্তিদায়ক আমার কাছে।”
এবার ভানু-কে নিয়ে আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মুখ খুললেন যমালয়ে জীবন্ত ভানু ছবির ছবিখ্যাত পরিচালক কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “ ‘যমালয়ে জীবন্ত ভানু’ ছবি তৈরির আগে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে যত জেনেছি, ওঁকে নিয়ে আমার বিস্ময় উত্তরোত্তর তত বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন তিনি সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। বছর আট-নয় বয়স থেকে বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য যা যা করতেন উনি জানলে চমকে যেতে হয়। সেটা ১৯৩৭-৩৮ সাল। ওইটুকু বয়সে কুট্টি ভাষা শিখেছিলেন - পূর্ববঙ্গের মাঝিমাল্লারা নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলত। কেন শিখেছিলেন? না তখন বড় বড় নৌকোয় ঘোড়ায় চেপে ব্রিটিশ সৈনিক, অফিসাররা নদী পারাপার করতেন। মাঝিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে, ওই ভাষায় কথা বলতে বলতে আড়ি পেতে শুনতেন ওঁরা কী আলোচনা করছেন, বিপ্লবীদের নিয়ে কোনও পরামর্শ করছেন কি না। সেসব শুনে গিয়ে বলতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো মানুষদের। আর এসবের বদলে হয়ত বিপ্লবীরা তাঁকে আদর করে দিতেন মিষ্টি, লজেন্স অথবা সিনেমা দেখার টিকিট। এরপর আরও খানিক পর এক ব্রিটিশকে প্রচণ্ড মারধর করে সেখান থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। ওই শুরু তাঁর কলকাত্তাইয়া জীবন।”

“আমার মনে হয়, না মনে হয় না...আমার বিশ্বাস আজকের সময় যদি উনি বেঁচে থাকতেন, সমর্থ থাকতেন টলিপাড়ার সবথেকে প্রতিবাদী চরিত্র হতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল ওঁর রক্তে! যা ঠিক, যা সত্যি তার জন্য ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আজীবন লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। শ্যাম-কূল দুই বাঁচানোর এই মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না কোনওকালে। একটা উদাহরণ দিলে বুঝবেন। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মুক্তির সময় বেজায় সমস্যায় পড়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। বসুশ্রী প্রেক্ষাগৃহে সেই ছবির মুক্তি আটকাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন উত্তমকুমারের নেতৃত্বে থাকা শিল্পীদের একটি দল। তাঁরা পিকেটিং করে, হাল্লা করে একাকার। সেই মিছিলে ছিলেন জহর রায়- যিনি নিজেই এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তা যাকগে। ভানুবাবু কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে ছিলেন! বসুশ্রীর বাইরে নিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিবাদ জানাতে। সেই সত্যজিৎ রায়ের জন্য, যাঁর ছবিতে তিনি কোনওদিন কাজের জন্য ডাক পাননি। আমি বলতে চাইছি,যেটা ওঁর ঠিক মনে হয়েছিল উনি সেই পক্ষই নিতেন...ওঁর কথা সেই পক্ষ ভাবছে কি না সেসব না ভেবেই। যাকে বলে সিংহহৃদয়!”
আরও পড়ুন: ‘রক্তের সম্পর্কই সব নয়’— ‘পরিবার’, ‘অত্যাচার’ নিয়ে বিস্ফোরক পোস্ট সঞ্জয় দত্তের মেয়ে ত্রিশলার!
তবে খারাপ লাগে অভিনেতা হিসেবে যোগ্য সম্মান পেয়ে যাননি এই মানুষটি। সেকথা উনি নিজেও একাধিকবার বলেছেন। আক্ষেপ করেছেন। কমেডি ছবিকে যে দর্শক-সমালোচকেরা উঁচু নজরে দেখেন না, তা নিয়ে ওঁর গভীর দুঃখ ছিল। নিজেই বলতেন, “উচ্চশিক্ষিত বাঙালির মনে হয়, যদি সহজেই হাসি পায় এমন ছবি দেখে তাঁরা হেসে ফেলেন, সুখ্যাতি করেন তাহলে বুঝি তাঁদের মান যায়! তবু এই উপেক্ষার মাঝেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন অমরত্ব। যাক সেসব কথা....আমার মনে হয় আজকেই এই লোকঠকানো সমাজে, জাল-জুয়োচুরি করার দিনে, ছেলে ভোলানো গল্প শোনানোর সময়ে ওঁর মত মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল আমাদের। যাঁর হাসির মধ্যেও তীব্র প্রতিবাদ থাকত, অন্তরালে থাকত গভীর বার্তা।”
