রুপোলি পর্দার দুনিয়ায় সাধারণত প্রতিটি সংলাপের দাপট মাপা হয় কোটি টাকার অঙ্কে। যেখানে সুপারস্টারদের শিডিউল পেতে নির্মাতাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে রিতেশ দেশমুখের সাম্প্রতিক মেগা প্রজেক্ট ‘রাজা শিবাজি’ এক অনন্য নজির স্থাপন করল। বক্স অফিসের সাফল্যের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক অ্যাকশন-ড্রামাটি এখন চর্চায় রয়েছে তার বিরল কাস্টিং প্রক্রিয়ার জন্য। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের বীরগাথা নিয়ে তৈরি এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য বলিউডের প্রথম সারির একঝাঁক তারকা কোনও পারিশ্রমিকই নেননি, যা বর্তমান বাণিজ্যিক সিনেমার যুগে কার্যত অভাবনীয়। বর্তমান সময়ে যখন প্রতিটি সেকেন্ডের হিসেব হয় কোটি টাকায়, সেখানে স্রেফ বন্ধুর ডাকে এবং আদর্শের প্রতি টানে প্রথম সারির বলি তারকাদের এই পদক্ষেপ  আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আজও মানবিকতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিতেশ দেশমুখ আবেগঘন কণ্ঠে ভাগ করে নিয়েছেন পর্দার নেপথ্যের সেইসব অলিখিত চুক্তির কথা। রিতেশ জানান, এই ছবির পুরো কাস্টিংই দাঁড়িয়ে রয়েছে স্রেফ নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর শ্রদ্ধার ওপর। সলমন খান, অভিষেক বচ্চন, বিদ্যা বালন, ফরদিন খান থেকে শুরু করে বোমান ইরানির মতো তারকারা যখন এই প্রজেক্টে যুক্ত হন, তখন তাঁদের মধ্যে পারিশ্রমিক নিয়ে কোনও কথাই ওঠেনি। রিতেশের কথায়, এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের উত্তরাধিকারের প্রতি বিনোদন জগতের এক সম্মিলিত প্রণতি।

 

 

বিশেষ করে অভিষেক বচ্চনের প্রসঙ্গ টেনে রিতেশ এক অদ্ভুত বিশ্বাসের গল্প শুনিয়েছেন। ছবির চরিত্র কী হবে বা তাঁর স্ক্রিন টাইম কতটা, সেসবের তোয়াক্কা না করেই রিতেশের একটি ফোন কলে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন অভিষেক। এই ভ্রাতৃত্ববোধ কেবল অভিষেকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সলমন খানের সঙ্গেও রিতেশের সম্পর্ক এমনই এক গভীর আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। অভিনেতা-পরিচালক রিতেশ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কিছু সম্পর্ককে টাকার অঙ্কে বিচার করা অসম্ভব। দীর্ঘ ২৩ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি মানুষের যে বিশ্বাস অর্জন করেছেন, আজকের এই পারিশ্রমিকহীন কাজগুলোই তার সবথেকে বড় স্বীকৃতি।

সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে নিবিড় গবেষণার পর রিতেশ যখন ‘রাজা শিবাজি’র চিত্রনাট্য সাজিয়েছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল বলিউড এবং মারাঠি সিনেমার সেরা প্রতিভাদের এক সুতোয় গাঁথা। সেই লক্ষ্যে তিনি সফল তো বটেই, বরং এই প্রজেক্টটি এখন আর কেবল রিতেশের একার স্বপ্ন হয়ে থাকেনি। এটি জেনেলিয়া দেশমুখসহ প্রতিটি অভিনয়শিল্পীর কাছে এক একটি আবেগঘন যাত্রায় পরিণত হয়েছে। ছবির প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে আছে তাঁদের শ্রম এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য।

বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতির হিসেব নিকেশ সরিয়ে রেখে ‘রাজা শিবাজি’ আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার মূলে রয়েছে টিমওয়ার্ক এবং ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা। রিতেশ দেশমুখের এই ‘প্যাশন প্রজেক্ট’ প্রমাণ করে দিল যে, সঠিক উদ্দেশ্য আর অটুট বন্ধুত্ব থাকলে আজও বলিউডের অন্দরে অর্থের চেয়ে শিল্পের সম্মান অনেক বেশি দামী। বড়পর্দার এই যুদ্ধজয় কেবল শিবাজি মহারাজের লড়াইকে তুলে ধরছে না, বরং আধুনিক বিনোদন জগতের পর্দার আড়ালে থাকা কিছু খাঁটি মানবিক সম্পর্কের জয়গানও গাইছে।