আজকের সময়ে প্রেম আর আলাদা করে কোনও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায় না। সে কখনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কখনও সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, আবার কখনও সমাজের চাপের নিচে পড়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালায়। এই বাস্তবতার দিকেই তাকিয়ে আছে নতুন বাংলা ছবি ‘সুলভ কমপ্লেক্স’, যেখানে প্রেম কোনও কল্পনার গল্প নয়, বরং প্রতিদিনকার জীবনের কঠিন সত্য।

এই গল্পের পটভূমি কোনও সাজানো শহুরে স্পেস নয়। এখানে নেই রঙিন পার্ক, নেই নিখুঁত প্রেমের ফ্রেম। ছবির কেন্দ্রবিন্দু এক সাধারণ হাউজিং কমপ্লেক্স ও তার আশপাশের এলাকা যেখানে মানুষ বাস করে, কাজ করে, সন্দেহ করে এবং বিচার করে। এই পরিবেশেই চোখে পড়ে এক তরুণী, যাকে ঘিরে নানা রকম ফিসফাস। কারও চোখে সে বিপজ্জনক, কারও চোখে সে অস্বস্তিকর উপস্থিতি। পরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় সে প্রতিমা নয়, সে ফতেমা। অর্থাৎ তাঁর ধর্ম আলাদা। মুখ্য দুই ভূমিকায় রয়েছেন অর্পণ ঘোষাল এবং দেবলীনা কুমার। 

ফতেমা শহরে বাঁচে নিজের পরিচয় ঢেকে রেখে। কাজ করে রান্নার, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। দিনের শুরু ভোরে, শেষ হয় ক্লান্তিতে। অবজ্ঞা আর অপমান তার নিত্যসঙ্গী। নিজের মুসলিম পরিচয় গোপন রাখাই তার বেঁচে থাকার কৌশল। এমনকী যাদের জন্য সে রান্না করে, তাদের অনেকেই জানতে চাইলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

">

এই জীবনের মাঝেই আসে বাপন। পেশায় সে কাজ করে একটি সুলভ শৌচালয়ে। তার জীবনও খুব বড় নয়, খুব নাটকীয়ও নয়। কিন্তু সে লক্ষ্য করে, প্রতিদিন এক বোরখা পরা মহিলা সেখানে আসে, ভেতরে ঢুকে পোশাক বদলায় এবং চুপচাপ চলে যায়। কৌতূহল থেকেই শুরু হয় কথাবার্তা। সেই কথাবার্তাই ধীরে ধীরে খুলে দেয় ফতেমার জীবনের দরজা। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফতেমার ফোন ভেঙে যায়। ছোট্ট সেই ঘটনায় বাপন পাশে দাঁড়ায়। পরে স্টেশনের এক কোণে বসে ফতেমা বলে ফেলে তার জীবনের কথা- দারিদ্র্য, একাধিক কাজ, আর দিনের পর দিন দ্বৈত পরিচয়ে বেঁচে থাকার ক্লান্তি। সেই গল্প শোনার মধ্যেই বাপনের মনে জায়গা করে নেয় এক অচেনা টান।ধীরে ধীরে গভীর হয় সম্পর্ক। ফতেমা বাপনের জন্য রান্না করে, দু’জনের জীবনে আসে স্বস্তি। কিন্তু এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নয়। ধর্মই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা। বাপনের মা এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। সমাজের চোখ আরও তীক্ষ্ণ হয়।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ফতেমার পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর। কাজ হারায় সে, ভেঙে পড়ে মানসিকভাবে। তখন বাপনই তাকে আবার দাঁড়াতে শেখায়। পালিয়ে যাওয়া নয়, লড়াই করাই যে একমাত্র পথ, সেই বিশ্বাসেই তারা শুরু করে নতুন কিছু।ফুটপাথের ধারে জন্ম নেয় একটি ছোট খাবারের দোকান ‘দিল মাঙ্গে বিরিয়ানি’। এই দোকান শুধু পেট ভরানোর জায়গা নয়। এটা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা, ভালবাসার ঘোষণা, আর সমাজের বিভাজনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

">

ক্যামেলিয়া প্রোডাকশনস প্রাইভেট লিমিটেড প্রযোজিত এই ছবির পরিচালনায় রয়েছেন শ্রীকান্ত রায় ও অর্ক রায়। গল্প লিখেছেন অর্ক রায়। ছবির গতি সংযত, কিন্তু বক্তব্য স্পষ্ট। আবেগ এখানে চিৎকার করে না, বরং ধীরে ধীরে দর্শকের ভেতরে ঢুকে পড়ে। দেবলীনা কুমার ও অর্পণ ঘোষাল চরিত্রে এমন স্বাভাবিক যে গল্পটাকে অভিনয় বলে মনে হয় না, মনে হয় দেখা কোনও বাস্তব জীবনের টুকরো।

‘সুলভ কমপ্লেক্স’ আসলে প্রেমের গল্পের ছদ্মবেশে বলা এক সময়ের দলিল। এখানে ভালবাসা কোনও বিলাস নয়, বরং সাহসের ফল। বহুবার প্রেমকে সাজানো জায়গায় বসিয়ে দেখা হয়েছে। এবার সেই প্রেমের জন্ম হোক ভিড়, প্রশ্ন আর লড়াইয়ের মাঝখানেই।

 ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে ‘সুলভ কমপ্লেক্স’।