সদ্যই কলকাতার বুক থেকে মুছে ফেলা হল সোহরাওয়ার্দীর নামের রাস্তা। সেই রাজপথের নতুন নাম হয়েছে গোপাল মুখার্জি রোড। সোহরাওয়ার্দী বললেই 'বাংলার কসাই' হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর কথাই মনে পড়ে। কিন্তু আদতে যে রাস্তার নাম বদলানো হল সেটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ভাইস চ্যান্সেলর স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে। ফলে এই নাম বদলের পর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই গোটা বিষয়ে এবার মুখ খুললেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র। 

আজকাল ডট ইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুভ্রজিৎ এই নাম বিভ্রাট বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেন, "স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, এবং তিনিই কিন্তু বীণা দাসকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এই কাজের জন্য নাইটহুডও পেয়েছিলেন। ফলে তিনিও যে খুব একটা সুবিধার লোক ছিলেন, সেটা তো নয়। হাসান সোহরাওয়ার্দী ব্রিটিশদের পা চাটা ছিলেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরোধী ছিলেন। আর তাছাড়া যাঁর সঙ্গে তাঁকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে বলে এত শোরগোল, তাঁদের দু'জনের শরীরে তো একই রক্ত বইছে। একই পরিবারের। স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর বোনের ছেলে ছিলেন হুসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী। ওঁদের নাম কলকাতা থেকে কেন, ভারত থেকে মুছে থেকে ফেলা উচিত। ওই পরিবারের জন্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস হয়েছে। বাঙালি তো আত্মবিস্মৃত জাতি, সব ভুলে যায়। কিন্তু ওঁরা, ওই পরিবার যে অপরাধ করে গিয়েছেন, সেই অপরাধের কোনও ক্ষমা হয় না।" 

'কলকাতার কসাই'য়ের আত্মীয়ের নামে নামাঙ্কিত রাস্তা বর্তমানে 'গোপাল মুখার্জি রোড'। সেই গোপাল পাঁঠার নামে এই রাস্তার নাম রাখা হল, যাঁর জন্য কলকাতা আজ ভারতের অংশ। গোপাল মুখার্জি ওরফে যাঁকে সকলে গোপাল পাঁঠা বলে চেনেন তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন শুভ্রজিৎ মিত্র। তাঁদের দুই পরিবারের মধ্যেও ছিল ব্যাপক ঘনিষ্ঠতা। সেই স্মৃতি হাতড়ে 'দেবী চৌধুরানী'র পরিচালক বলেন, "গোপাল দাদুকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। উনি আমার দাদুর বন্ধু ছিলেন। আমার বড় দাদু ছিলেন সন্তোষ মিত্র, আরও একজন বড় দাদু হলেন শ্রীশচন্দ্র মিত্র, অর্থাৎ যিনি রডা কোম্পানির অস্ত্র লুঠ করেছিলেন যিনি। আমাদের বাড়িতেই মাউজার পিস্তলগুলি রাখা ছিল। বউবাজারে আমাদের যেখানে বাড়ি তার পাশেই হচ্ছে মলঙ্গা লেন, যেখানে গোপাল দাদুর বাড়ি। উনি আমার দাদুর খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। গোপাল দাদুর নামে এই রাস্তার নাম হয়েছে সেটা খুবই আনন্দের বিষয়। এবং খুবই যোগ্য পদক্ষেপ।" 

ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়ে তাঁর আরও সংযোজন, "আমার এখনও মনে আছে, আমি তখন খুবই ছোট, বাবার সঙ্গে বেরোতাম যখন, তখন দাদুকে দেখতাম। একটা লাল রোয়াকে তিনি বসে থাকতেন বিকেলবেলা। মুখ ভর্তি বড় দাড়ি, আর মাথায় টপ বান করা থাকত। আর গেলেই আমায় লজেন্স দিতেন, আর বাবার থেকে দাদুর খোঁজ নিতেন। আমার দাদুকে 'দাদা' বলতেন, 'বলাইদা বলাইদা' বলতেন। ওখানে জলের কলের যে পুজো হয়, সেখানে প্রতি বছর উনি অকাল বোধনের মূর্তি করতেন। ১০৮ টা পদ্মের একটা কম পড়েছিল বলে, রাম তীর-ধনুক দিয়ে নিজের চোখ উপড়ে ফেলছে, সেই মূর্তি বানাতেন। ছোট থেকে দেখে আসছি জলের কলের পুজোয় ওটা হতো। ২৩ জানুয়ারি নেতাজির মূর্তির সামনে একটা বড় করে অনুষ্ঠান হতো। যত বছরের জন্মদিন, ততগুলো তোপ ফাটানো হতো। এসব ছোট থেকে দেখে বড় হয়েছি।" 

গোপাল পাঁঠার থেকে কখনও ১৯৪২ সালের রক্তাক্ত কলকাতার হাড়হিম করে দেওয়া সেসব ঘটনার কথা শুনেছেন কিনা জানতে চাইলে শুভ্রজিৎ বলেন, "আমি যেহেতু তখন খুবই ছোট তাই শোনা হয়নি। খুব বেশি হলে বছর ১০-১১ বয়স হবে তখন আমার। কিন্তু ওঁকে খুব স্পষ্ট ভাবে মনে আছে আমার। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা হতো।"