উইলিয়াম শেক্সপিয়র যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো বলে উঠতেন— “জোহার!” (সাঁওতালি সম্ভাষণ)। ব্রিটেনের ধ্রুপদী সাহিত্য, রোমানিয়ার আন্তর্জাতিক মঞ্চ আর ভারতের আদিবাসী ঐতিহ্য— এই তিনের এমন অপূর্ব কোলাজ বোধহয় ইতিহাস এর আগে কখনও দেখেনি। রোমানিয়ার ‘আন্তর্জাতিক শেক্সপিয়ার উৎসব’ কাঁপিয়ে, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের কুর্নিশ কুড়িয়ে ‘দ্য উইল অফ শেক্সপিয়র’-এর টিম এবার ঝড় তুলল কলকাতার ঐতিহাসিক টাউন হলে। সাঁওতালি ভাষায়, আদিবাসী নাচ-গানের ছন্দে যখন মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠল ‘হ্যামলেট’, ‘ম্যাকবেথ’ আর ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’, তখন দর্শকদের আসনে বসে হাততালি না দিয়ে পারলেন না খোদ টেনিস কিংবদন্তি লিয়েন্ডার পেজ!
ভুবনেশ্বরের ‘কিট’ (KIIT) এবং ‘কিস’ (KISS) বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন আদিবাসী ও ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তের তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এই নাট্যদল। কোনও পেশাদার গাইডেন্স ছাড়াই, এই তরুণ তুর্কিরা নিজেরাই শেক্সপিয়রের কালজয়ী ট্র্যাজেডিগুলোকে রূপান্তর করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন এবং মঞ্চে আগুন ঝরানো অভিনয় করেছেন।
কলকাতার টাউন হলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আবেগঘন হয়ে পড়েন টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ। শেক্সপিয়রের সর্বজনীন আবেগগুলো যে কোনও ভৌগোলিক বা ভাষাগত সীমানা মানে না, তা প্রমাণ করে দিল এই প্রযোজনা।

সাঁওতালি হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ: ‘হ্যামলেট’-এর সেই নৈতিকতার লড়াই, শোক আর প্রতিশোধের আগুন কিংবা ‘ম্যাকবেথ’-এর লাগামহীন ক্ষমতার লোভ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা— সবটাই আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
রোমিও-জুলিয়েটের আদিবাসী প্রেম: দুই পরিবারের চিরাচরিত সংঘাত আর প্রেমের চিরন্তন আখ্যান যখন সাঁওতালি লোকসঙ্গীত, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য আর নিজস্ব নান্দনিকতায় মঞ্চস্থ হলো, তখন উপস্থিত দর্শকদের গায়ের লোম খাড়া হতে বাধ্য।
উদ্যোক্তাদের পক্ষে শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী অচ্যুতানন্দ সামন্ত স্পষ্ট ভাষায় বললেন, “ ‘দ্য উইল অফ শেক্সপিয়র' কেবল একটা নাটক বা থিয়েটার প্রযোজনা নয়, এটা আদতে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাঁওতালি ভাষা এবং ভারতের সমৃদ্ধ আদিবাসী ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে উদযাপন করা, আর তার জন্য শেক্সপিয়রের চেয়ে বড় মাধ্যম আর কী-ই বা হতে পারত!”
এই নাট্যদলের যাত্রা কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। এই বছরের শুরুর দিকেই রোমানিয়ার ক্রাইওভাতে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ‘আন্তর্জাতিক শেক্সপিয়ার উৎসব’-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিল এই দল। বিশ্বমঞ্চে বিদেশি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করার পর দেশে ফিরতেই এই তরুণ শিল্পীদের স্বাগত জানায় স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ভবন। ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু নিজে এই শিক্ষার্থীদের পিঠ চাপড়ে প্রশংসা করেন, যা ভারতের আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণের লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
ইউরোপের মঞ্চ কাঁপানোর পর তিলোত্তমার বুকেও শেক্সপিয়ারের এই আদিবাসী অবতার যেভাবে সফল হলো, তা এক কথায় অনবদ্য। ক্ল্যাসিক সাহিত্য যে কেবল লাইব্রেরির তাকে বন্দি থাকার জন্য নয়, বরং তা সাঁওতালি মাদলের বোলেও নতুন প্রাণ পেতে পারে— তা কলকাতার টাউন হল আজীবন মনে রাখবে।














