জ্বলে ওঠার, জ্বালিয়ে দেওয়ার গল্প নিয়ে হাজির ‘কালীপটকা’। সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
কালীপটকা দেখেছেন? লালরঙা সরু ফিনফিনে একরত্তি বাজির সলতেয় আগুন ধরলে কেমন করে ফাটে? সমাজ যাদের হারিয়ে দিতে চায় পদে পদে, প্রান্তিক জীবনেও অলীক স্বপ্ন আঁকড়ে বাঁচা সেই ‘হেরো’ মেয়েরাও কিন্তু এক্কেবারে এক রকম। বুকের ভিতর কানায় কানায় বারুদ ঠাসা। সলতেয় আগুনের ফুলকি ছুঁলেই হল! সশব্দে ফেটে পড়বে!
তবে সেই মেয়েদেরই গল্প বলা জি ফাইভের নতুন সিরিজ কিন্তু নামেই ‘কালীপটকা’। আওয়াজে-তেজে ঢের ঢের গুণ বেশি। সাধে কি মুক্তির পর থেকেই নেটপাড়া কাঁপিয়ে ছেড়েছে! প্রাথমিক ভাবে কারণ দুটো। বাংলা সিরিজের নিরিখে পর্দায় নৃশংসতার ভাগ গা শিউরে ওঠার মতো। আর দ্বিতীয়ত, সিরিজের চার সাহসী কন্যার মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজের ফুলঝুরি। এ দুটো কারণ চুম্বক হয়ে আপনাকে তা দেখতে বসার দিকে টেনে নিয়ে যেতেই পারে। কিন্তু সিরিজটা দেখতে শুরু করলে বুঝবেন ‘কালীপটকা’র এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে মূল কারণ তার অসম্ভব টানটান গল্প এবং তুখোড় অভিনয়ের যুগলবন্দি। যার কৃতিত্ব অবশ্যই পরিচালক-কাহিনিকার অভিরূপ ঘোষ, চার কন্যের ভূমিকায় স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, শ্রুতি দাস, শ্রেয়া ভট্টাচার্য ও হিমিকা বসু এবং খল চরিত্রেও বাজিমাত করা অনির্বাণ চক্রবর্তীর।
গল্পের শুরুতেই দর্শকের পরিচয় হয় একই বস্তির বাসিন্দা চার আগুনে মেয়ের সঙ্গে। অভাব-অনটন, জীবনের সব রকমের নেতিবাচকতার সঙ্গে তাদের নিত্যদিনের লড়াই। একটানে পাঁঠার শরীর চিরে ফেলতে ওস্তাদ, পেশায় কশাই শ্রীমা (স্বস্তিকা) তার মধ্যেই একার মালিকানায় খাসির মাংসের দোকান করার স্বপ্ন দেখে। শাশুড়ি আর একরত্তি ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়া অটোওয়ালি রানি (শ্রুতি) স্রেফ একটু ভাল করে বাঁচতে চেয়ে কাজল সেজে নিজের যৌবন বেচে রোজ রাতে। মাতাল বরের যাবতীয় বায়নাক্কা থেকে মারধর মুখ বুজে সয়ে রোজ কাঁদতে কাঁদতেও মিনতি (শ্রেয়া) নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে চায়। ঋণের বোঝা আর পাওনাদারের গুঁতো সামলে কনটেন্ট ক্রিয়েটার হয়ে ওঠা রিঙ্কুর (হিমিকা) একমাত্র স্বপ্ন দশ মিলিয়ন ফলোয়ার! জীবনযুদ্ধে লাগাতার বিষের জ্বালা তাদের মুখে খিস্তিখেউরের ফুলঝুরি ছোটায়। শরীর-মন থেকে কেড়ে নিতে চায় নারীসুলভ কমনীয়তা। একটানা লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চার কন্যের কাছে তবু অক্সিজেন নিজেদের বন্ধুত্ব। যে বন্ধুত্ব তাদের জুগিয়ে দেয় আরও একটু এগিয়ে যাওয়ার, আরও একটু রুখে দাঁড়ানোর শক্তি।
এ হেন চার কন্যের জীবন পাল্টে যায় আচমকাই। মদের ঠেকের মালিক রানার (অনির্বাণ) সঙ্গে চ্যালেঞ্জ হেরে মারকুটে স্বামী বাড়ি থেকে সব টাকাপয়সা জোর করে নিয়ে যেতে গেলে রুখে দাঁড়ায় মিনতি। এতদিন ধরে বন্ধুদের জোগানো সাহসে ভর করে স্বামীকে সে পাল্টা আঘাত করতে গেলে অনিচ্ছাকৃত ভাবেই তার প্রাণ চলে যায়। ভীত, সন্ত্রস্ত মিনতির পাশে এসে দাঁড়ায় তিন বন্ধু। ঠিক করে, মিনতির ছোট্ট মেয়েটার ভবিষ্যতের স্বার্থেই এই অপরাধ ঢাকাচাপা দিতে হবে তাদের। কিন্তু কী করবে তারা? পুলিশের সন্দেহ থেকে কি আড়াল করতে পারবে নিজেদের? এখানেই কি শেষ? নাকি এক অপরাধ ঢাকতে গিয়ে ক্রমশ অপরাধের জালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়তে হবে চার জনকেই? তারই জমাটি কাহিনি এই সিরিজ জুড়ে।
অভিনয়ে কিন্তু দশে কুড়ি পেতেই পারে ‘কালীপটকা’। প্রথমত স্বস্তিকা— বয়স যত বাড়ছে, ততই যেন হিরের মতোই চোখ ঝলসে দিচ্ছে তাঁর অভিনয়ের দ্যুতি। যার জোরে মধ্যবয়স ছুঁইছুঁই, মুখের উপর সাফ কথা বলা, অসমসাহসী এবং বলশালী শ্রীমা যেন পর্দায় নয়, ঘোর বাস্তবে দেখা দেয়। অটোওয়ালি থেকে যৌনকর্মী, দুই ভূমিকাতেই সমান সাবলীল শ্রুতিকে দেখে বাস্তবের গ্ল্যাম-কন্যাকে চেনার জো নেই। নিজের জীবনের খারাপগুলোকে কপালের দোষ বলে মেনে নেওয়া অবলা থেকে বুদ্ধিতে-ক্রূরতায় রীতিমতো সবলা হয়ে ওঠা মিনতিকে ভীষণ রকম জীবন্ত করে তুলেছেন শ্রেয়াও। বরং তিন কন্যের তুলনায় রিঙ্কু হিসেবে খানিকটা কমজোরি ঠেকে নবাগতা হিমিকার অভিনয়। এ সিরিজে যথারীতি নজর কাড়েন আরও একজন। ‘একেনবাবু’র সরল সাধাসিধে মোড়ক থেকে আপাদমস্তক বিপরীত মেরুর রানাকেও সমান বিশ্বাসযোগ্যতায় গড়েছেন অনির্বাণ। রানার স্ত্রীর ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে চোখ টেনে ছেড়েছেন রুকমা রায়ও।
শুধু অভিনয় কেন, অসম্ভব দ্রুততায় ছুটে চলা গল্পের বলিষ্ঠতাও কি কম নাকি! টানটান প্লট, একেবারে অপ্রত্যাশিত দুরন্ত সব টুইস্ট এবং নির্মেদ গল্প বলার ভঙ্গীতে ছোট্ট ছোট্ট সাত পর্বের সিরিজ এক মুহূর্তেও জন্যও চোখ ফেরাতে দেয় না। সংলাপে অশ্রাব্য গালিগালাজের ফুলঝুরি নিয়ে অনেকে হয়তো নাক কুঁচকোতেই পারেন। তবে সিরিজটা দেখতে বসলে, তার গল্পের প্রেক্ষাপট কিংবা চরিত্রদের জীবনযাপন ও চলনবলনের সঙ্গে পরিচয় হলে এত গালিগালাজের বুনোট আর বেমানান লাগে না। বরং মনে হয়, শহুরে ‘ভদ্র’ সংলাপই বরং বেখাপ্পা ঠেকতে পারত।
তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস কিছুটা অস্বস্তি জোগায়। তা হল সিরিজের নানা মোড়ে নৃশংস দৃশ্যের ডিটেলিং। গল্পের প্রয়োজনে নৃশংসতা বা হিংস্রতা হয়তো আসতই। কিন্তু তার পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃশ্য বর্ণনা দর্শকমনে বাড়তি চাপও ফেলে। গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু কী দেখাব এবং কতটা দেখাব, সে তো পরিচালকের হাতেই থাকে। সে দিকটাও একটু ভাবার, বিশেষত এখনকার অপরাধপ্রবণ সমাজে। এইটুকুই।
