ওটিটি-কাহিনিতে ধরা দিল আরও এক সাড়াজাগানো অপরাধ। ‘দিল্লি ক্রাইম সিজন ৩’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত। 

 


বেবি ফলককে মনে পড়ে? প্রায় দেড় দশক আগে যে একরত্তি মেয়ের সুস্থতা কামনায় একজোটে প্রার্থনা করেছিল গোটা দেশ? ২০১২ সাল। দিল্লির এইমস হাসপাতালে হাজির কিশোরী কন্যে। কোলে বছর দুইয়ের এক শিশুকন্যা। মাথার খুলি ফাটা। হাত-পা ভাঙা। গালে, শরীরে আঁচড়-কামড়, পোড়ার ক্ষতচিহ্নে ভরা। ওইটুকু মেয়ের অবস্থা দেখে শিউরে উঠেছিলেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক থেকে দুঁদে পুলিশকর্তা প্রত্যেকেই। কিশোরী মেয়েটি প্রথমে নিজেকে শিশুটির মা বলে পরিচয় দিলেও তদন্তে ক্রমেই বেরিয়ে আসতে থাকে আরও ভয়ঙ্কর সব তথ্য। জানা যায়, শিশুটির জন্মদাত্রী মা নারীপাচারের শিকার। নানা জায়গায় হাতবদল হয়ে সে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। একরত্তি ফলকও এহাত-ওহাত ঘুরতে ঘুরতে অত্যাচারের শিকার। লাগাতার তদন্ত, অভিযানে ধরাও পরে পাচারচক্রের বেশ কয়েকজন। সেরে উঠুক ফলক— প্রার্থনায় সামিল হয় গোটা দেশ। আশাপূরণ অবশ্য হয়নি। প্রায় দু’মাস যমে-মানুষে টানাটানির পরে লড়াই শেষ হয়ে যায় একরত্তি মেয়ের। 

 

 

সেই হাড়হিম করা ঘটনাই এবার নেটফ্লিক্সের পর্দায়। জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘দিল্লি ক্রাইম’-এর তৃতীয় সিজনের কেন্দ্রবিন্দুতে। সৌজন্যে পরিচালক তনুজ চোপড়া এবং তাঁর কাহিনিকারদের দল। প্রথম দুই সিজনের মতো এবারও মুক্তি পেয়েই সাড়া ফেলেছে নতুন সিজন। ‘ম্যাডাম স্যর’ বর্তিকা চতুর্বেদী (শেফালি শাহ), এসিপি নীতি সিং (রসিকা দুগল) এবং তাঁদের দলবলের সঙ্গে দর্শকও কখনও ছুটেছেন দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, কখনও ফুটেছেন উত্তেজনায়, কখনও বা ভেঙে পড়েছেন হতাশা কিংবা গ্লানিতে। কখনও আবার পাচারচক্রের নেপথ্য নারী ‘বড়ি দিদি’র (হুমা কুরেশি)র হিমশীতল অপরাধপ্রবণতা ভয়ের স্রোত বইয়ে দিয়েছে তাঁদের শিরায় শিরায়। চুম্বক হয়ে দর্শককে সিরিজের শেষলগ্ন অবধি টেনে বসিয়ে রেখেছে প্রত্যেকের অসামান্য অভিনয়। 

 


এবারের গল্পে ডিআইজি বর্তিকা (শেফালি) উত্তরপূর্ব ভারতে কর্মরত। সেখানেই এক অভিযানে ট্রাক থেকে উদ্ধার করা হয় পাচার হতে বসা একদল নাবালিকাকে। জানা যায়, ইতিমধ্যে মিজোরাম থেকে আসা আরও এক ট্রাক বোঝাই মেয়ে বেরিয়ে গিয়েছে দিল্লি অভিমুখে। যেনতেনপ্রকারেণ সেই ট্রাকে বন্দি নাবালিকাদের উদ্ধার করার লক্ষ্যে দিল্লি ফেরে বর্তিকা। ইতিমধ্যে দিল্লিতে সাড়া ফেলে দিয়েছে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। মাথায়, মুখে-সহ গোটা শরীরে গুরুতর আঘাত-সহ একরত্তি এক শিশুকন্যাকে এইমস হাসপাতালের স্ট্রেচারে শুইয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে এক কিশোরী। সেই শিশু বেবি নুরের মায়ের সন্ধানে দিল্লি তোলপাড় করে ফেলতে প্রস্তুত এসিপি নীতি সিং (রসিকা)। বর্তিকা দিল্লিতে পৌঁছনোর পরে তদন্তের এক সূত্র ধরে আঁচ মেলে দুই ঘটনাই এক সুতোয় বাঁধা। জোড়া তদন্তে সঙ্গী হয়ে জুটে যায় বর্তিকা-নীতির পুরনো দল ভূপেন্দ্র সিং(রাজেশ তৈলং), সাব ইনস্পেক্টর জয়রাজ (অনুরাগ অরোরা), বিমলা (জয়া ভট্টাচার্য)-রা। ইতিমধ্যে সমান্তরালে দর্শক দেখতে থাকেন, কীভাবে ঠান্ডা মাথা আর বলিষ্ঠ পরিকল্পনায় ভর করে  হরিয়ানার রোহতকে বসে দেশজোড়া নারীপাচার চক্র পরিচালনা করছে বড়ি দিদি ওরফে মিনা (হুমা), তার সহযোগী কুসুম (সায়নী গুপ্ত) এবং দিল্লির চাঁই কল্যাণী (মিতা বশিষ্ঠ)। এতটুকু এধার থেকে ওধার হলে প্রাণ কেড়ে নেওয়া যে বড়ি দিদির বাঁয়ে হাত কা খেল, মিজোরাম থেকে পাচার হয়ে আসা মেয়েরা কি গিয়ে পড়ল তারই খপ্পরে? বেবি নুরের এমন পরিণতিও কি এই পাচার চক্রের কারণেই? নাওয়া-খাওয়া ভুলে তদন্ত অভিযানে দিল্লি-হরিয়ানা-রাজস্থান-মহারাষ্ট্র ছুটে বেড়ায় বর্তিকা, নীতি-সহ গোটা দল। খোঁজ পাওয়া যাবে নুরের মায়ের? পাচার হয়ে আসা নাবালিকাদের রক্ষা করতে পারবে তো পুলিশ? কেনই বা নিজে মেয়ে হয়েও মেয়েদের এমন শত্রু হয়ে উঠল বড়ি দিদি? সব প্রশ্নের উত্তর দেবে টানটান উত্তেজনায় ঠাসা ছয় পর্বের সিরিজ।

 

 

প্রথম সিজন থেকেই বাস্তবতায়, তুখোড় অভিনয়ে, গল্পের ঠাসবুনোটে চমক দিয়েছিল ‘দিল্লি ক্রাইম’। তৃতীয় সিজনে এসে বর্তিকা, নীতি ও তাদের দলবলের অভিনয় যেন আরও শানিত, আরও বাস্তব থেকে উঠে আসা। এ সিরিজে কর্মসূত্রে লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তিকা কিংবা নীতির ব্যক্তিগত জীবনেও ঝড় ওঠে সমানতালে। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, একরোখা, কর্মনিষ্ঠ বর্তিকার চরিত্রে শেফালি এ সিজনে আরও গভীর, আরও পোক্ত। কখনও নাছোড় জেদ, কখনও ক্ষোভ, হতাশা, কখনও অপরাধবোধের গ্লানি, কখনও বা ক্লান্তি পেরিয়ে জয়ের হাতছানি—সবটাই উঠে আসে তাঁর চোখে, বাঙ্ময় হয়ে ওঠে অভিব্যক্তি। রসিকাও নীতির ভূমিকায় ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা আর আবেগে ভীষণ রকম জীবন্ত। রাজেশ, জয়া, অনুরাগরাও কর্তব্যপরায়ণতা, টিম স্পিরিট আর ঠান্ডা মাথায় ততটাই নজরকাড়া। এঁদেরই বিপ্রতীপে হুমা। বড়ি দিদি-র চরিত্রে ঠিক যতখানি নৃশংসতা, অপরাধমনস্কতা, বুদ্ধিমত্তা ও আবেগহীনতার প্রয়োজন ছিল, বলিষ্ঠ অভিনয়ে তার সবটুকু যেন কানায় কানায় পূর্ণ করে ছাড়েন হুমা। বলা ভাল, কখনও কখনও শেফালিকেও যেন ছাপিয়ে যান। পাচার-রানির ডান হাত হিসেবে ঠিক যতখানি বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার ছিল, ততটাই সাবলীলভাবে তৈরি করতে পেরেছেন সায়নী। অন্যদিকে, মিতার অভিনয়ের বলিষ্ঠতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার থাকেনা। সমাজসেবার আড়ালে নারীপাচার করতে ঠিক যেমনটা ঘিনঘিনে চরিত্র হয়ে উঠতে হয়, কল্যাণীকে সেভাবেই আপাদমস্তক গড়েছেন মিতা। গল্পে যে সব দৃশ্যে তাঁর উপস্থিতি, আর কোথাও চোখ যেতে দেননি। 

 

বেবি ফলকের কাহিনি পর্দায় তুলে আনাটাই হাড়হিম করে দিতে বাধ্য। তাতে তুখোড় অভিনয়, রুদ্ধশ্বাস ঘটনাক্রম যেন আরও ভয় ধরায়। নারীপাচারের গা শিউরে দেওয়া সেই উপাখ্যানে সুতোর টানে গোটা পরিকাঠামোর কলকাঠি নাড়ছে এক নারী। তার বিশ্বস্ত সঙ্গীরাও প্রত্যেকে মহিলা। এ বিষয়টা শুধু ভয় নয়, মাথার ভিতর কেমন যেন একটা বাড়তি অস্বস্তি তৈরি করে ছাড়ে। সেই দমবন্ধ করা অনুভূতি নিয়েই প্রায় পঞ্চাশ মিনিট পার করা একেকটা পর্ব দেখে ফেলা। সিরিজ শেষ হওয়ার পরেও যার রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ।