এবার কাস্টমসের দুনিয়ায় স্পাই থ্রিলারের বুনোট। ‘তষ্করি’র মার্কশিট নিয়ে হাজির পরমা দাশগুপ্ত।
থ্রিলার জিনিসটাই এমন যে ঠিকঠিক মশলায়, ঠিকমতো রান্না হলে কারও সাধ্য কী তার থেকে চোখ সরাবে! বিশেষত স্পাই থ্রিলার। সবার চোখের সামনে থেকেও অবলীলায় আড়ালে সেঁধিয়ে থাকা গুপ্তচরের চোখ ঝলসানো বুদ্ধিমত্তায়, পুলিশ কিংবা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির দুরন্ত অ্যাকশনে অপরাধ চক্রের দোর্দণ্ডপ্রতাপ বেতাজ বাদশার গোহারা হেরে যাওয়ার কাহিনি। তাতে মন মজবে না, এমন থ্রিলারপ্রেমী কই!
বলিউডি ওটিটি দুনিয়ায় সেই ঘরানাতেই বহুদিন হল মন কেড়েছেন নীরজ পাণ্ডে। একের পর এক চোখ-ধাঁধানো রহস্যভেদের কাহিনি, বিশেষত ‘স্পেশাল অপস’-এর মতো চমকে দেওয়া স্পাই থ্রিলারে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। সেই ধারাতেই যখন ফের একটা নতুন সিরিজ নিয়ে হাজির হন নীরজ, প্রত্যাশার পারদ যে আকাশ ছোঁবে, তা আর আলাদা করে বলে দিতে হয়না। ইমরান হাশমি অভিনীত সেই সিরিজ, ‘তষ্করি’ নিয়ে তাই শুরু থেকেই আগ্রহ তুঙ্গে।
ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির চেনা ছক ভেঙে নীরজের এবারের স্পাই থ্রিলারের ঠিকানা মুম্বই এয়ারপোর্টের কাস্টমসের দুনিয়া। বাণিজ্যনগরীর এই বিমানবন্দর বরাবরই স্মাগলিংয়ের হটস্পট বলে পরিচিত। সোনা থেকে হেরোইন, ঘড়ি থেকে ব্যাগ, এমনকী বিরল প্রজাতির প্রাণী পাচারের সহজ পথ হিসেবে বারবারই শিরোনামে উঠে এসেছে এই এয়ারপোর্ট। তাতে জড়িত থাকার অভিযোগে এখানকার কাস্টমস অফিসারদের দিকেও নানা সময়ে উঠেছে অভিযোগের আঙুল। টাকার টোপে বিকিয়ে যাওয়া অজস্র মানুষের হাতে হাতে গড়ে ওঠা সেই আঁধার দুনিয়াতেই আলো ফেলেছে এই সিরিজ।
গল্পের শুরুতে দেখা যায়, ভোটের আগে নিজেদের আস্তিন সাফ করতে উঠেপড়ে লেগেছে শাসকদল। মন্ত্রীর নির্দেশে মুম্বই এয়ারপোর্টের দুর্নাম ঘোচাতে স্মাগলিংয়ের বাড়বাড়ন্ত একেবারে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে উদ্যোগী হয় কাস্টমস দফতর। দুর্নীতিবাজ অফিসারদের কবজা থেকে মুম্বই বিমানবন্দরকে মুক্ত করার ভার দেওয়া হয় তরুণ অফিসার প্রকাশ সিং(অনুরাগ সিনহা)-কে। বেছে বেছে দল গড়ে সে সাসপেনশন থেকে কাজে ফিরিয়ে নেয় তিন তুখোড় অফিসার অর্জুন মিনা (ইমরান হাশমি), মিতালি কামাথ (অম্রুতা খানভিলকর) এবং রবিন্দর গুজ্জরকে (নন্দিশ সন্ধু)। প্রকাশের নির্দেশে অর্জুন ও তার দুই সহকর্মী দলবল নিয়ে নেমে পড়ে। তাদের পাখির চোখ সোনা পাচারকারী, ইতালির মিলানের বাসিন্দা বড়া চৌধুরী (শরদ কেলকার)-এর রমরমা চক্রকে সমূলে বিনাশ করা। কাস্টমসের নিজস্ব গুপ্তচর চক্রকে কাজে লাগিয়ে সত্যিই কি লক্ষ্যভেদ করতে পারবে অর্জুন? স্মাগলিং ঠেকাতে বুদ্ধির লড়াইয়ে কি শানিয়ে উঠতে পারবে তার টিম? কুখ্যাত অপরাধীর সঙ্গে টক্করে নামার মাসুলই বা কতটা গুনতে হবে? সেসব নিয়েই এগিয়েছে সাত পর্বের এই সিরিজ।
নীরজের ছবিতে কিংবা সিরিজে বরাবরই চোখ টানে গল্প বলার ধরন। প্রত্যেকটা মোড়ে মোড়ে পাল্টে যেতে থাকে ক্লু, বদলে যেতে থাকে সন্দেহের অবকাশ। সঙ্গে থাকে চোর-পুলিশের লাগাতার বেদম ছুট। মানে একেবারে ক্যাট অ্যান্ড মাউস গেম। এ সিরিজেও তার ব্যতিক্রম নেই ঠিকই, তবে ইন্টেলেজেন্স-এর চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে কাস্টমসের জগতে এসে পড়ায় জুড়ে বসেছে প্রোটোকলের বেড়ি। ফলে গল্পের গতি কিংবা তুখোড় বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন, দুই-ই এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে নির্দিষ্ট ছকে। গল্পে তাই ‘স্পেশাল অপস’-এর মতো দুরন্ত টুইস্ট কিংবা জমজমাট অ্যাকশন খুঁজলে কিছুটা হতাশ হতে হয়। প্রথম গোটা তিনেক পর্বও যেন এগোয় কিছুটা ঢিমেতালে, একটার পর একটা প্রত্যাশিত মোড় পেরিয়ে। তবে হ্যাঁ, চার নম্বর পর্ব থেকে ঘুরতে থাকে গল্প। ক্রিকেটের ভাষায় এক্কেবারে ঘূর্ণি পিচ যেন! আর তাই দ্বিতীয়ার্ধে এসে পুরোপুরি ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে মন দিয়েছেন পরিচালক-কাহিনিকার জুটি। চমকে দেওয়া ট্যুইস্টে সিরিজও ফিরে পেয়েছে টানটান উত্তেজনার চেনা স্বাদ।
পোস্টার থেকেই দর্শক জেনে গিয়েছিলেন এ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ইমরান। এক সময়ের ‘কিসিং হিরো’-র ইমেজ ইদানীং আপাদমস্তক ভেঙেচুরে দিচ্ছেন তিনি। সদ্য ‘হক’ ছবিতে আইনজীবীর চরিত্রে তুমুল প্রশংসা কুড়োনোর পরে এ সিরিজেও প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন অভিনেতা। অর্জুনকে তাই ভীষণ রকম জীবন্ত লাগে। আগুনে আঁচে পোড়া তুখোড় অফিসার তথা সিঙ্গল মাদার মিতালীকে যত্নে বুনেছেন অম্রুতা। পুরোদস্তুর ঘুষখোর পরিবারের ছেলে হয়েও অসম্ভব সৎ, নির্ভীক রবিন্দরকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন নন্দিশ। প্রকাশের চরিত্রে ঝকঝকে লাগে অনুরাগকেও। তবে ইউরোপ থেকে এশিয়া তথা ভারত জুড়ে পাচার-জাল ছড়িয়ে রাখা বড়া চৌধুরী হিসেবে অবশ্য ততটা দাগ কাটেননি শরদ। গল্ফ স্টিকের বাড়িতে মানুষ মারা ছাড়া তেমন নৃশংস দেখায়না তাঁকে।
সিরিজের হাইপয়েন্ট? নিঃসন্দেহে তার দুর্দান্ত রিসার্চ। স্মাগলিংয়ের দুনিয়ার ছোট্ট ছোট্ট নিখুঁত ডিটেল থেকে পাচারের হরেক রকম পদ্ধতির সঙ্গে দর্শকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া — কোথাও এতটুকু ফাঁক রাখেননি নীরজ ও তাঁর দলবল। আর তাতেই একটা আলাদা মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে ‘তষ্করি’। মাস্টারস্ট্রোক তো একেই বলে, নাকি?
