হত্যা-প্রতিশোধের পুরুষালি দুনিয়ায় রানিদের কাহিনি। ‘কুইনস’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
ছোটবেলায় পড়া সেই ফিনিক্স পাখির গল্পটা মনে পড়ে? ধ্বংসের আগুন পেরিয়ে ছাই থেকে যে বার বার নতুন করে জন্ম নিতে জানে, জানে উড়াল দিতে। অপরাধের আগুনে বিনা দোষে পুড়ে ছাই হওয়ার পরে প্রতিশোধের জ্বালাতেও কি সেভাবেই জন্ম নেয় ফিনিক্স? তেমনই একদল আগুনপাখির গল্প বলেছে হইচইয়ে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সিরিজ ‘কুইনস’।
‘ডাইনি’র সাড়াজাগানো সাফল্যের পরে ফের নির্ঝর মিত্রের পরিচালনায় ফের ওটিটি পর্দায় মিমি চক্রবর্তী। ফলে প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল শুরু থেকেই। বলতে বাধা নেই, সে প্রত্যাশার অনেকখানি পূরণও করেছে ক্ষমতার লড়াইয়ে হিংসা-প্রতিহিংসার এই রুদ্ধশ্বাস কাহিনি।
রাজনীতি-গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের যে রক্তঝরা পৃথিবীকে এক কালে চিনিয়েছিল ‘গডফাদার’, সেই ট্র্যাডিশন মেনে ‘কোম্পানি’, ‘সরকার’, ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মতো হিন্দি ছবিতে আগেই অভ্যস্ত ছিলেন দর্শক। ওটিটি আসার পরে গা শিউরে দিয়েছে হিন্দির ‘মির্জাপুর’, ‘আরিয়া’ কিংবা বাংলার ‘রাজনীতি’। সেই তালিকাতেই নবতম সংযোজন ‘কুইনস’। তবে ফারাক একটাই। হত্যা-প্রতিশোধের এই রক্তমাখা পুরুষালি জগতে এ সিরিজ লাইমলাইটে টেনে এনেছে নারীদের। রাজায় রাজায় যুদ্ধের দুনিয়ায় চিরকালের উলুখাগড়ারাই এখানে রানি। ক্ষমতার টক্করের ময়দানে তাদের পা রাখা এখানে স্রেফ বদলার আগুনে জ্বলে ওঠা নয় বরং নিজেদের নতুন করে জন্ম দিয়ে টিকে থাকার লড়াই।
গল্পের শুরু উত্তরবঙ্গের সাহেববাড়িতে, মীরার (মিমি) বিয়ের রাতে। তার শ্বশুর, এলাকার জনপ্রিয়তম নেতা মানিক সরকারের (কৌশিক চ্যাটার্জি) একদা প্রিয়তম বন্ধু নীলমণি (জয়দীপ মুখার্জি) এখন তাঁর চরমতম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
নারীপাচারের কারবারে বারবার বাধা হয়ে ওঠার অপরাধে মানিক ও তার তিন ছেলেকেই শুটআউটে হত্যা করায় এলাকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ মাফিয়া নীলমণি ও তার ছেলে শঙ্কর (অর্ণ মুখোপাধ্যায়)। তাই বিয়ের রিসেপশন চলাকালীনই প্রাণ যায় মীরার শ্বশুর মানিক, স্বামী অর্জুন (রাহুল দেব বসু), ভাসুর শুভ (যুধাজিৎ সরকার) এবং উজ্জ্বলের। সরকার বাড়িতে অসহায় হয়ে পড়ে থাকে মীরা, তার শাশুড়ি সাবিত্রী (বৈশাখী মার্জিত) এবং দুই জা ঝুমা (দেবযানী সিংহ) ও পলি (পায়েল দে)। নীলমণি-শঙ্করের পাশে শক্তি হয়ে এসে দাঁড়ান দুর্নীতিপরায়ণ স্থানীয় বিধায়ক এবং পুলিশ-প্রশাসন। এদিকে মীরাকে পোড়াতে থাকে প্রতিশোধস্পৃহার আগুন। অচিরেই সে বুঝতে পারে— শুধু বদলা নয়, ভয়কে জয় করে বেঁচে থাকতে হলে তাদের বদলে যেতে হবে। মাখতে হবে রক্ত। সে কথা সে বুঝিয়ে ছাড়ে বাকি তিন জনকেও। প্রতিহিংসার সেই জ্বালায় শাশুড়ি সাবিত্রী বুনে দেন অপরাধদমনের খিদেকেও। চার স্বামীহারার ভরসা হয়ে ওঠে স্থানীয় ধোপাবস্তির ছেলে, সরকার পরিবারের দীর্ঘদিনের অনুগত ভোলা (দুর্বার শর্মা) ও তার দলবল। তারপর কী হবে? এই অসম লড়াইয়ে কি শেষ পর্যন্ত জিততে পারবে সরকারবাড়ির চার রানি? সে গল্পই বলেছে ‘কুইনস’।
রাজনীতি, অপরাধ, দুর্নীতি আর ক্ষমতা দখলের কাহিনি বরাবরই পর্দায় আসে রক্তে মাখামাখি হয়ে। এ সিরিজ তার ব্যতিক্রম নয়। তবু তার পাশাপাশি সমানভাবে চোখ টানে মীরার নেতৃত্বে চার নারীর ফিনিক্স হয়ে ওঠার সফর। যার শুরুটা হয়েছিল স্বামীদের হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া টালমাটাল জীবনে, চোখের সামনে মৃত্যু কিংবা নৃশংসতা দেখতে না পারার অসাড়তায়। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ তাদের একটানে এনে ফেলে অপরাধের অলিগলি চেনা সাহসী সংগ্রামে। পাশের বাড়ির সাদামাটা নারী থেকে অদম্য সাহসে ভর করে রানি হয়ে ওঠার এই যাত্রায় সেই প্রতিটা অনুভূতির ওঠাপড়া ছুঁয়ে দিয়ে যায় দর্শকমন। সেখানেই নির্ঝরের চেনা মুন্সীয়ানা।
থ্রিলারপ্রেমী দর্শক হয়তো গল্প কিছুটা এগোলেই বুঝতে পারবেন তা কোনদিকে গড়াতে চলেছে। প্রত্যাশিত পথেই হেঁটেছে ছোট ছোট সাত পর্বের এই সিরিজ। তবে টানটান শুরুর পরে মাঝের দিকের পর্বগুলোয় গল্পের গতি বেশ খানিকটা ঢিমে হয়ে গেলেও দুরন্ত ক্লাইম্যাক্স সেই ছড়ানো সুতোগুলোয় ফের ঠাসবুনোট ফিরিয়ে দেয়। ইদানীং ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গ ওটিটিপাড়ার প্রিয়তম লোকেশন। নীল-সবুজের মায়াবী রহস্যে, কুয়াশা মোড়া ধূসরতায় তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে প্রসেনজিৎ চৌধুরীর ক্যামেরাও।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে গোটা সিরিজটাই প্রায় দাঁড়িয়ে আছে মিমির কাঁধে ভর করে। মীরার অসহায়তা থেকে ফুঁসে ওঠার সফরে তাঁকে জীবন্ত লাগে প্রায় সর্বত্র, মাঝেসাঝে কণ্ঠস্বরের পুরুষালি গাম্ভীর্য একটু বেতাল ঠেকলেও। তবে নামে ‘কুইনস’ হলেও কার্যত মিমি একাই এ গল্পের রানি বলা চলে। বাকি তিন নারী চরিত্রে আবেগ বা টানাপোড়েনের মুহূর্ত কিংবা মীরার হুকুম তামিল ছাড়া তেমন কিছু করার ছিল না বৈশাখী, দেবযানী কিংবা পায়েলের। অসহায় নারীদের আগুনপাখি হয়ে ওঠার এই কাহিনিতে মীরার সঙ্গে অন্তত তার দুই জাকে সমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখলে হয়তো আরও একটু ভাল লাগত। চার রানির পাশে ঢালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ভোলা হিসেবে দুর্বার যথারীতি অনবদ্য। কমেডি থেকে অপরাধ-দুনিয়ার কাঠিন্যেও তিনি সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য। নীলমণির চরিত্রের কুটিল হিংস্রতা, ছক কষা অপরাধমনস্কতায় পাল্লা দিয়ে চোখ টানেন জয়দীপ। পাশাপাশি শঙ্করের নাছোড় নিষ্ঠুরতা কিংবা পুরোদস্তুর শীতল নৃশংসতায় অর্ণ রীতিমতো অস্বস্তি জাগিয়ে ছাড়েন তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয়ে। সরকারবাড়ির পুরুষ চরিত্রে কৌশিক, যুধাজিৎ, রাহুলদের ঝুলিতে অবশ্য দু’একটা দৃশ্য ছাড়া প্রাপ্তি বলতে কিছুই ছিলনা। দক্ষ অভিনেতাদের এভাবে অব্যবহারে অবহেলা করাটা একটু চোখে লাগে বটে।
তবে শুরুতেই ‘শোলে’র দৃশ্য কিংবা ঘোর বাস্তবে নিরাপত্তা রক্ষীর হাতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু মনে পড়িয়ে দেওয়া সিরিজটা দেখতে বসে একটা প্রশ্ন শুরু থেকে শেষ অবধি ভাবায়। এক নিমেষে জীবন ছারখার হয়ে যাওয়ার প্রতিশোধ নিতে চার অসহায় নারী ময়দানে নামতেই পারে অদম্য জেদে। কিন্তু ফ্ল্যাশব্যাকের মীরা যেখানে পাশের বাড়ির মেয়েটির মতোই সাধারণ, সেখানে সে এমন দুঁদে অপরাধীদের মতো পাকা মাথায় নিখুঁত ছক কষে লড়াই চালায় কীভাবে? আজকালকার দর্শক শুধু আবেগেই আর সন্তুষ্ট নন। তাঁরা কিন্তু যুক্তিও খোঁজেন।
প্রশ্ন আছে আরও একখান। মিমি চক্রবর্তী আর কত স্লিম হবেন?















