সমাজের চেহারায় আয়না ধরতে কতটা সফল ‘আদালত ও একটি মেয়ে’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত। 


১৯৮১। দর্শক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিল একটি সাহসী বাংলা ছবি। তপন সিংহের পরিচালনায় ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ ছবি তুলে ধরেছিল এক বীরাঙ্গনার কাহিনি। বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষিতা হওয়ার পরেও সমাজের তরফে আসা যাবতীয় প্রতিকূলতার বাধা ঠেলে যে আদালতে দাঁড়িয়ে সুবিচার আদায় করে ছেড়েছিল।


২০২৬। এবারেও দর্শক মহলে সাড়া ফেলে দিল একই নামের একটি ওয়েব সিরিজ। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় হইচই-এর নতুন সিরিজ হেঁটেছে আগের চেনা ছক ধরেই। এ ক্ষেত্রে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধর্ষিতা হয় অফিস পার্টিতে। তারপর আদালতে সমাজের সেই চেনা প্রতিকূলতাকে জয় করে তার সুবিচার পাওয়ার পালা। 


প্রশ্নটা আসলে অন্য জায়গায়। চার দশক আগের ছবির মতো এই সিরিজও তার গল্পের রসদ তুলে এনেছে এই সমাজ থেকেই, আলো ফেলেছে সমাজের মানুষদের মানসিকতায়। ১৯৮১ থেকে ২০২৬— মাঝে পেরিয়ে গিয়েছে পঁয়তাল্লিশটা বছর। তবু জীবনযাপন থেকে জীবনবোধ যেখানে হুড়মুড়িয়ে পাল্টে যাচ্ছে রোজ, শোরগোল ফেলছে প্রযুক্তি থেকে উন্নয়ন, সেখানে চারপাশের মানুষ, তাঁদের চিন্তাধারা এখনও সেই একই আঁধারে আটকে, এই বিষয়টা চিন্তা বাড়ায় বইকি!
সিরিজের গল্পে শুরুতেই দেখা যায় একটি নামী সংস্থার চিফ মার্কেটিং অফিসার জয়িতা (কৌশানী মুখোপাধ্যায়) থানায় পৌঁছয় নেশাগ্রস্ত অবস্থায়। সে অভিযোগ জানায়, বছর শেষের অফিস পার্টিতে মাদক মেশানো ককটেল খাইয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তার অনুমান, অপরাধী তারই বস, অফিসের এক কর্ণধার দিবাকর করঞ্জাই ওরফে ডিকে (সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়), যদিও এর কোনও অকাট্য প্রমাণ তার কাছে নেই। এই লড়াইয়ে যাদের সবচেয়ে বেশি পাশে পাওয়ার কথা ছিল জয়িতার, পুলিশ-প্রশাসন থেকে বাড়ির লোক, হবু স্বামী কিংবা অফিসের সহকর্মীরা— তারা কেউ ব্যস্ত থাকে অপরাধ ঢাকাচাপা দিতে, কেউ চায় লোকলজ্জার ভয়ে ঘটনা আড়াল করতে, কেউ বা এই সুযোগে পেশাগত শত্রুতায় সহকর্মীর গায়ে কাদা ছেটাতেও পিছপা হয়না।

জয়িতার লড়াইয়ে ঢাল হয়ে এসে দাঁড়ায় তার বাবা এবং তার আইনজীবী সেবন্তী (বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়), যে অফিসেরই অন্য কর্ণধার রাজদীপ দত্তের (প্রতীক দত্ত) স্ত্রী এবং জয়িতার স্কুলের সিনিয়রও বটে। সেবন্তীই এ লড়াইয়ে সামিল করে তার মনোবিদ বন্ধু মণিকে (রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়)। বিপক্ষের দুঁদে উকিল (কৌশিক সেন) যতই জয়িতাকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করুক, শেষমেশ তারা জয় ছিনিয়ে আনে। কিন্তু সত্যিই কি ডিকে এই ঘৃণ্য অপরাধ ঘটিয়েছে?  নাকি অন্য কেউ আছে এর নেপথ্যে? কীভাবেই বা জয়িতার জন্য সুবিচার আদায় করবে সেবন্তী? এই সব প্রশ্নেরই উত্তর রাখা সিরিজের সাতটি পর্বে। 


চেনা পরিসরে জানা গল্প। তবু সিরিজটা দেখতে ভাল লাগে দুটো কারণে। প্রথম কারণ অবশ্যই কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের চিরাচরিত মুন্সিয়ানা। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গী, পেঁয়াজের খোসার মতো অন্ধকারের পরত সরাতে সরাতে একটানে সত্যিকে আলোয় নিয়ে আসা এবং অপরাধী ও নিগৃহীতার মনের অলিতে গলিতে ঘুরে তাদের মনস্তত্ত্বকেও গল্পের অন্যতম চরিত্র করে তোলা। 
দ্বিতীয় কারণ অভিনেতাদের বলিষ্ঠতা। কিছুদিন হল ছক ভাঙা চরিত্রে চোখ টানছেন কৌশানী। এ সিরিজও তার ব্যতিক্রম নয়। ডি-গ্ল্যাম লুকে ভেঙেচুরে যাওয়া জয়িতাকে তিনি যত্নে গড়েছেন। ডিকে হিসেবে সৌম্য, রাজদীপের ভূমিকায় প্রতীক, মজায় মোড়া মনোবিদের ছোট্ট উপস্থিতিতে রাহুল, মহিলা পুলিশের অফিসারের সংক্ষিপ্ততম অথচ চোখটানা চরিত্রে দীপান্বিতা সরকার কিংবা জয়িতার হবু বর বিতানের চরিত্রে অনিরুদ্ধ গুপ্ত— প্রত্যেকেই যে যার মতো করে নজর কেড়ে ছাড়েন অভিনয়ের গুণে। বিপক্ষের উকিল হিসেবে ছোট পরিসরেও কৌশিক যথারীতি নিজের জাত চিনিয়ে দেন। তবে আলাদা করে যার কথা বলার মতো, তিনি বাসবদত্তা। বলিষ্ঠ আইনজীবী থেকে স্কুলের জুনিয়রের সহমর্মী বন্ধু কিংবা যে অফিসের পার্টি ঘিরে এতকিছু, তারই কর্ণধারের স্ত্রী—সেবন্তীর অনুভূতির ওঠাপড়া থেকে দোলাচল, সত্যপ্রতিষ্ঠা থেকে সুবিচার আদায়, সিরিজ জুড়ে এই পুরো সফরটাতেই বাসবদত্তা ভীষণ রকম জীবন্ত। 


তবু এক-আধটা জায়গা একটু ক্লিশে লাগে। যেমন, অপরাধের প্লট আর একটু অচেনা হলে হয়তো আরও খানিকটা উপভোগ্য হত এ সিরিজ। পাশাপাশি মনের মধ্যে অপরাধের অভিঘাত বোঝাতে, ট্রমার গতিপ্রকৃতি চিনিয়ে দিতে ডিসটর্টেড ভিস্যুয়াল এত বেশিবার ঘুরেফিরে আসাটাও একটু ক্লান্তিকর ঠেকে এক-আধ সময়ে। আর সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে পড়ে— আদালত যে সিরিজের পটভূমি, সেখানে গল্পের বড় অংশটাই দাঁড়িয়ে আছে তার বাইরে। কোর্টরুম ড্রামায় আইনি টক্করই মন কাড়ে বেশি। সেখানে এ সিরিজে সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশটা ছোট আর অপেক্ষাকৃত সহজ হয়েই রয়ে গেল।   


কিন্তু একটা বিষয় সিরিজ শেষের পরেও মাথার ভিতরে ঘুরপাক খায় বহুক্ষণ। বলা ভাল, অস্বস্তিতেই ফেলে। পর্দার হবু বরদের কি সব সময়েই একটু এসকেপিস্ট ধাঁচের হতেই হবে? ১৯৮১-র সিনেমায় নায়িকা ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে তার হবু বর বিয়েটাই ভেঙে দিয়েছিল। ২০২৬-এর সিরিজে বিতান মৌখিক ভাবে জয়িতার পাশে থাকলেও ঘটনার পর থেকেই বারবার প্রমাণের অভাব কিংবা লোকলজ্জার প্রসঙ্গ তুলে তার লড়াইয়ের জমিটাকে দুর্বল করে তুলতেই বেশি সচেষ্ট। পর্দার কাহিনির শিকড় তো সাধারণত ঘোর বাস্তবেই ছড়িয়ে। তবে কি সাড়ে চার দশক পরেও এ সমাজের পুরুষ হবু স্ত্রীর বিপদে পুরোদস্তুর পাশে দাঁড়িয়ে তার মনোবল বাড়ানোর জায়গায় পৌঁছতেই পারল না ?