কীভাবে, কতটা দাগ কাটল ভূমি পেডনেকরের নতুন সিরিজ? ‘দলদল’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।

ভাবা গিয়েছিল এ সিরিজ হবে ‘হু ডান ইট’। কিন্তু গল্প এগোতে দেখা গেল, অপরাধীদের চেনা যাচ্ছে প্রায় শুরুর দিকের পর্ব থেকেই। তাই বদলে বরং ‘হোয়াই ডান ইট’-এর অলিগলি বেয়ে সাইকোলজিক্যাল ড্রামার খাতাতেই নাম লিখিয়ে ফেলল ‘দলদল’। অ্যামাজন প্রাইমে ভূমি পেডনেকরের নতুন ওয়েব সিরিজ। 

‘দলদল’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ কাদা বা জলাভূমি। এ সিরিজ অবশ্য পথ হাঁটে মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা কাদার মতো অতীত ঘেঁটে। যে কাদায় একবার পা পিছলে গেলেই হল! তলিয়ে যেতে হয় অপরাধমনস্কতার গলিঘুঁজিতে। সিরিজ জুড়ে সেই অপরাধমনস্কতার পিছনেই ছোটে মুম্বইয়ের কনিষ্ঠতম ডিসিপি রিটা ফেরেইরা (ভূমি) এবং ইনস্পেক্টর ইন্দু মাত্রে (গীতা আগরওয়াল শর্মা)। ছুটতে ছুটতেই রিটার লড়াই চলে তার নিজের দগদগে অতীতের সঙ্গে। লড়াই চলে খাস পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অন্দরে মৌরসিপাট্টা গেড়ে থাকা পুরুষতন্ত্রের সঙ্গেও। 

গল্পের শুরুতে দেখা যায়, যৌনপল্লিতে থেকে শিশুকন্যাদের পাচার রুখে দিয়ে শহরের কনিষ্ঠতম ডিসিপি পদে প্রোমোশন পায় রিটা। তাতেই সে হয়ে ওঠে পুরুষ সহকর্মীদের ঈর্ষার কেন্দ্রবিন্দু। অচিরেই রিটা এ-ও বুঝতে পারে তার এই প্রোমোশন আসলে পুলিশ কমিশনার সঞ্জয় দেশপাণ্ডের (সন্দেশ কুলকার্নি) পিআর স্টান্ট মাত্র। এ সবের মধ্যেই হইচই ফেলে দেয় সমাজকর্মী মনোহর স্বামী (অনন্ত মহাদেবন)-এর নৃশংস হত্যা। যার তদন্তভার পায় রিটা। জানা যায়, এই খুনের সঙ্গে কোথাও জড়িয়ে গিয়েছে মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া এক তরুণ সাজিদ (আদিত্য রাওয়াল)। তদন্তে বেরিয়ে আসে হাতের শিরা কেটে এবং মুখে কোনও কিছু ঠেসে দিয়ে শ্বাস রোধ করে হত্যার এই একই ছকে আগেও খুনের ঘটনা ঘটেছে মুম্বইয়ে। এবং এক অনলাইন নিউজ পোর্টালে সেই সব ঘটনারই খবর লেখা একই সাংবাদিক অনিতা আচার্যর (সামারা তিজোরি) কলমে। শুধু তাই নয়, একই ধাঁচে খুন হতে থাকে আরও। কারা আছে এই সিরিয়াল কিলিংয়ের নেপথ্যে? কী করেই বা সব খবর পৌঁছয় অনিতার কাছে? অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব চিনে এই হত্যালীলা কি বন্ধ করতে পারবে রিটা? সেই নিয়েই এগোয় সিরিজের গল্প।

মাদকাসক্তি, সমাজকল্যাণের নামে অপরাধচক্র, পুরুষতন্ত্রের জোরজুলুমের মতো সমাজের অন্ধকার দিকগুলো, অপরাধমনস্কতা, মনস্তত্ত্বের চোরা গলি—সব দিকেই আলো ফেলে এ সিরিজ। দেখিয়ে দেয় কেমন ভাবে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্টে। চিনিয়ে দেয় কেমন করে অতীতের ক্ষত দাগ কেটে যায় আগামীর চরিত্রে। সিরিজ জুড়ে সেই সফর, তার দোলাচল, তার কারণ এবং প্রভাব কেমন যেন দমচাপা অস্বস্তি বুনে দেয় গল্পের পরতে পরতে। রহস্যভেদের রোমাঞ্চে শিহরণ জাগা নয়, সিরিজটা দেখতে দেখতে বরং তাই মাথা ভারী হয়ে আসে, মনের ভিতরে জমাট বাঁধে খারাপ লাগা। সেটাই কি উদ্দেশ্য ছিল পরিচালক অমৃত রাজ গুপ্তার? হয়তো বা। 

তবে একইসঙ্গে থ্রিলার, সাইকোলজিক্যাল ড্রামা, কপ সিরিজ-এর বুনোট তৈরি করতে গিয়ে কেমন যেন গুলিয়ে গিয়েছে সবটা। পরিচালক-কাহিনিকার-সিনেম্যাটোগ্রাফারেরা সকলে মিলে যতটা জোর দিয়েছেন খুনের নৃশংসতার গ্রাফিক দৃশ্যায়নে, গল্পের মোড়গুলোয় ততটা বোধহয় নয়। তাই কপ সিরিজের চেনা ছক ধরে হাঁটা কাহিনিতে ট্যুইস্টগুলোও তেমন সজোরে মোচড় দিয়ে উঠতে পারে না। বরং উপর উপর, বলা চলে খানিকটা নীতিকথার ঢংয়ে তাদের পরত খোলে।   

সিরিজে অবশ্য তুরুপের তাস হয়ে থাকে তুখোড় অভিনয়। কিছুদিন আগের সাড়া ফেলে দেওয়া সিরিজ ‘ভক্ষক’-এর পরে এই সিরিজেও দুরন্ত ভূমি। ঘেঁটে যাওয়া গল্পেও তাঁর অনবদ্য অভিনয়ে রিটাকে ভীষণ রকম বাস্তব লাগে। সাজিদের ভূমিকায় চোখ টানেন আদিত্যও। তবে হ্যাঁ, ভূমিকে প্রায় সমানে সমানে টক্কর দিয়েছেন সামারা। অনিতা হয়ে তিনি প্রায় প্রতিটা দৃশ্যেই আলো কেড়ে ছাড়েন। স্নেহ আর কর্তব্যের মিশেলে ইনস্পেক্টর মাত্রেকে ভারী যত্নে গড়েছেন গীতা। ছোট্ট ছোট্ট চরিত্রে ভাল লাগে অনন্ত, সন্দেশদেরও। 

প্রাপ্তি হয়ে থাকে দুটো দৃশ্য। এক, জীবনযুদ্ধে জিতে যাওয়ার এক রাতে সাজিদ-অনিতার একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর কোলাজ। তার সবটাতেই বন্ধুত্ব, ভাললাগা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো। দুই, রিটা ডিসিপি হওয়ার পরে ইনস্পেক্টর মাত্রের আরতি করা। তাতেও যে অদৃশ্য এক স্নেহের বাঁধন। আপাদমস্তক অস্বস্তিতে ঠাসা, মুখে কাঁচা মাংস ঠেসে দেওয়া হত্যার গল্প বলা এক সিরিজে এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই যেন আলোর কুচি! চোখ পড়লেই ঝিকমিক!