পরিচালক রাতুল মুখার্জি আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ব্যবহার করে বানিয়েছেন 'পাঞ্চ'। রাতুলের বানানো প্রথম মাইক্রো শর্ট 'পাঞ্চ', নিজেই জানিয়েছেন পরিচালক৷ কিন্তু সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে হঠাৎ এআই-কে ব্যবহার করলেন কেন?

 আজকাল ডট ইনকে পরিচালক বলেন, "কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আমার পড়াশোনা। ২০০৯ সালে আমার সাবজেক্ট ছিল আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স৷ আগামী দিনে এই বিষয়টা এত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে, তখন বুঝতে পারিনি৷ কিন্তু আজকের দিনে এআই একটা শিল্প বলা যায়। আমাদের দেশের অন্যতম সেরা ফিল্ম ফেস্টিভাল ইফি ( IFFI Goa) সেখানে একটা আলাদা বিভাগ করা হয়েছে এআইয়ের জন্য৷ দেশ বিদেশের মানুষ এআই ব্যবহার করে সিনেমা বানাচ্ছেন৷ কিন্তু এখানে একটা বিষয় বলে রাখা দরকার, সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা যা দেখি, একটা বাঘ লাফিয়ে দু'টো মানুষের ঘাড়ে পড়ল, বা দু'জন ব্যাটসম্যান ব্যাট দিয়ে মারামারি করছে, এই পাঁচ সাত সেকেন্ডের ভিডিও কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স দিয়ে ফিল্মমেকিং নয়৷"

রাতুল বলেন, " এআই নিয়ে মানুষের কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেকটা বড় পরিসর দখল করে নেবে এআই। আমরা যদি খবরে চোখ রাখি, সেখানেও দেখব যশরাজ ফিল্মস থেকে রেড চিলিস এরা কিন্তু মাইক্রো ড্রামা স্পেসে ঢুকে পড়ছে৷ হলিউডে বেন অ্যাফ্লিক (Ben Affleck) এর এআই স্টুডিও ৬০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে নেটফ্লিক্স নিয়েছে৷ এআই নিয়ে মানুষের ধারণা যে এটা কাজ খেয়ে নেবে৷ তা কিন্তু নয়৷ যাঁরা এআই জানবেন না তাঁরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন কাজের দুনিয়ায়৷ কারণ, এআই পুরোটাই হিউম্যান ইনটেলিজেন্স দিয়ে বানানো৷" 

সিনেমার বিষয় বক্সিং, বক্সিংকে সিনেমায় বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে রাতুল বলেন, "বক্সিং নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলাম৷ যখন আমি পালক করেছিলাম, শাশ্বত চ্যাটার্জি আর রূপাঞ্জনা মিত্র অভিনয় করেছিলেন৷ তখন সদ্য পরিচালনা করা শুরু করেছি৷ বক্সিং নিয়ে লেখা গল্পটা প্রযোজকদের শুনিয়েছিলাম কিন্তু কাজটা করা হয়নি৷ আমার কাজ হল গল্প বলা৷ স্পোর্টস আমাদের অনেক কিছু শেখায়৷ জীবনে পরাজয় আসবেই।  হেরে যাওয়া এবং পরদিন আবার নতুন উদ্যমে উঠে দাঁড়ানো এটা খেলা আমাদের শেখায়৷ সেইসময় যখন বক্সিং নিয়ে গল্পটা লিখেছিলাম তখন আর গল্পটার বাস্তবায়ন হয়নি৷ আমি ক্রিকেট ফুটবল খুব ভালবাসি৷ ছেলের সঙ্গে আমি নিয়মিত ফুটবল দেখি৷ শুধু বক্সিং না, আমি স্পোর্টস বিষয়টাতেই আগ্রহী৷ এই গল্পের জন্য 'পাঞ্চ' নামটা যথার্থ মনে হয়েছে৷"

 এআই প্রসঙ্গে রাতুল বলেন,  "অনেক মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন আছে, কেউ ভয় পান, কেউ আবার বিশ্বাস করেন না। কারণ আমাদের চারপাশে এআই দিয়ে যেসব ভিডিও বানানো হয়, সেগুলো সৃজনশীল নয়৷ অনেক মানুষ ভাবেন এআই মানে চ্যাটজিপিটি, তা তো নয়৷ জিপিটি একটা মডেল৷ এটা একটা এআই টুল। এরকম অনেক টুল আছে এআইতে৷ প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, সেইসঙ্গে গল্পবলার ধরন বদলে যাচ্ছে৷ এআই আগামী দিনে সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যাপক বদল আনবে৷ আমার সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা এবং আমার প্রযুক্তির জ্ঞান দুই মিলে আমাকে কিছুটা সুবিধা দিয়েছে৷ এই প্রথম একটা মাইক্রো শর্ট যেখানে আমি নিজে এডিট করেছি, সাউন্ড ডিজাইন করেছি, স্কোরটাও আমার বানানো, 'রাইস ফ্রম দ্য ক্যানভাস' নাম। আমি ক্রিড বলে একটা ছবি দেখেছি৷ সেখানে বক্সিং কেন্দ্রীয় চরিত্র৷ এআই গল্পবলার ক্ষেত্রে একটা সেতুর মতো কাজ করছে৷ এখান থেকে আমার 'পাঞ্চ' বানানোর ভাবনা আসে৷ 

এআই-এর জন্য মানুষ কাজ হারাবেন৷ এমন আশঙ্কা প্রায়ই দেখা যায়৷ এই বিষয় রাতুল বলেন," অ্যাডব প্রিমিয়ার প্রোতে ক্রিয়েটর'স কাট এর একটা ফিচার এসেছে৷ যেখানে অটো এডিট করা যাচ্ছে৷ একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর কী করেন? পরপর সিন সাজান, সিনিয়র এডিটর এসে ফাইন টিউনিং করেন৷ এখন সব ছবি অ্যাডব প্রিমিয়ার প্রোতে এডিট করা হচ্ছে৷ প্রযুক্তি বদলাচ্ছে৷ সেখানে তো আমি বলার কেউ নই৷ প্রযুক্তি কেবল সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে বদল আনছে তা নয়, বিশ্বব্যাপী সমস্ত ক্ষেত্রে এআই বদল আনছে৷ কম্পিউটার আসার পরে যেমন বহু মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন৷ কিন্তু মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করা শিখে নিয়েছেন এবং কাজ পেয়েছেন। এক্ষেত্রেও তাই, এআই জানলে আপনি অনেক কম সময়ে অনেক কাজ করতে পারবেন৷ পৃথিবীটা বদলাচ্ছে, তাই আমাদেরও বদলাতেই হবে৷ এভাবেই ভাবা উচিত৷"

সিনেমা নিয়েও কথা বলেছেন রাতুল। "আকিরা কুরসওয়ার (Akira Kurosawa)  ভক্ত আমি৷ আমার ফিচার ফিল্ম 'ইকিরমিকির' সেজন্য রসমন প্রভাবিত৷ আমি বিশ্বসিনেমা দেখতে ভালবাসি৷ সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তো প্রত্যেক বাঙালির প্রিয়৷ তিনি একজন প্রতিষ্ঠান৷ এই ব্যতিরেকে আমার ওয়েস অ্যান্ডারসন-এর কালার গ্রেডিং ভীষণ ভাললাগে৷ উনি তিনটে রঙ ব্যবহার করতেন৷ এই সময় ধুরন্ধর বিশ্বব্যাপী সাফল্য পেয়েছে, এখানেও ভিস্যুয়ালে, শব্দের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে৷ প্রযুক্তি থাক না থাক, গল্প বলাটা ভাল এরকম ছবিই আমার দেখতে ভাল লাগে৷" রাতুলের সংযোজন। 

কাজের দুনিয়ায় প্রাসঙ্গিক থাকতে গেলে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু শিখতে হচ্ছে৷ এই বিষয় রাতুলের অভিমত, "আমি তো দেখেছি যখন কেউ টুইটার ব্যবহার করতেন না, তখন নিয়মিত টুইট করতেন অমিতাভ বচ্চন৷ ওঁর কোনও প্রয়োজন ছিল না।  এখনও দেখবেন পোস্টে নম্বর দিয়ে লেখেন৷ একটা ডায়েরির মতো বা বইয়ের মতো৷ বিবর্তন কিন্তু চিরকালের৷ আইটিতেও যে কোনও ইঞ্জিনিয়ারকে একটা সময়ের পরে স্কিলসেট বাড়াতে হয়৷ আমাদের চারপাশের দুনিয়ায় এত যদি প্রতিযোগিতা থাকে, সেখানে আমাকেও শিখতেই হবে৷ শেখার এই নিরবচ্ছিবন্ন প্রক্রিয়াকে সহজ ভাবে দেখলে বোধহয় মানসিক চাপ অতটা হয় না। শেখার এই প্রক্রিয়াটা জারি থাকতে হবে৷ জ্ঞানকে যদি সম্মান করি, জ্ঞান একটা পুজোর মতো৷ প্রতিদিন অল্প অল্প করে শিখতে হবে ধরা যাক যে কোনও বই আমি ১০ পাতা করে পড়লাম সেটাও আমাকে কিছু শেখাল৷ নিজের কাজকে ছাপিয়ে যাওয়াটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত লেখক যেমন বলেছিলেন স্টে হাংগ্রি স্টে ফুলিশ৷ যে কোনও কিছু শেখার জন্য প্রস্তুত থাকা খুব জরুরি৷"