মঙ্গলবার বিকেলে এক বিষণ্ণ গোধূলিতে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্ল্যামার দুনিয়ার কোনও চাকচিক্য নয়, বরং নিজের আজন্ম লালিত রাজনৈতিক আদর্শ এবং সাধারণ মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েই বিদায় নিলেন বিজয়গড়ের ‘বাবিন’। সেই শোকের আবহে যখন গোটা শহর জুড়ে কেবলই হাহাকার, তখন প্রিয় বন্ধুর বিদায়ে কলম ধরলেন কবি শ্রীজাত। তাঁর যন্ত্রণাসিক্ত গভীর ভালবাসার প্রতিটি অক্ষর এখন সমাজমাধ্যমে এক একটি দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘুরছে। আর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল শ্রীজাতর সেই কবিতা। নাম— ‘ভালবাসি’।

রাহুলের সত্তা জুড়ে ছিল দুটি জিনিস—তাঁর বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্বাস আর ফুটবলের প্রতি অগাধ টান। শ্রীজাত তাঁর কবিতায় সেই অমোঘ সত্যটিই তুলে ধরেছেন। কবি লিখেছেন:

“বুকের বাঁদিকে বরাবরই রাখা ছিল 
লাল নিশান আর নীল-সাদা জার্সিটা...”

আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সি আর হৃদয়ের বামপন্থার সেই মেলবন্ধন আজ চিতার আগুনে ছাই হয়ে গেলেও, শ্রীজাতর মতে, এই চিতা এত সহজে নিভবে না। কারণ, রাহুল যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ রেখে গেলেন, তার ভার বইবেন তাঁর বন্ধুরাই।

রাহুলের মাত্র ৪২ বছর বয়সে চলে যাওয়াটা কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না শ্রীজাত। তিনি লিখেছেন, যদি সম্ভব হতো, তবে তিনি নিজের আয়ু দিয়ে হলেও রাহুলকে ফিরিয়ে আনতেন। কবির কথায়:

“শর্ত ছাড়াই ভরে দিতাম ওই মুঠো,
আয়ু বিনিময় সম্ভব হতো যদি।”

 

 


পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী, কোনও স্টুডিও বা নন্দন চত্বরে রাহুলের দেহ রাখা হয়নি। সাদা কুর্তিতে পাথর হয়ে যাওয়া প্রিয়াঙ্কা সরকার আর ১১ বছরের সন্তান সহজ-এর উপস্থিতিতে অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়-সহ টলিউডের বহু নক্ষত্র। সিপিম নেত্রী দীপ্সিতা ধর-এর নেতৃত্বে বামপন্থী সমর্থকদের কণ্ঠে শোনা যায় ‘ইন্টারন্যাশনাল’ গান।


কবিতার শেষে শ্রীজাত এক অদ্ভুত জেদের কথা শুনিয়েছেন। খেলার ছলে যে রাহুল চিরতরে মাঠ ছেড়ে চলে গেলেন, তাঁর সেই ‘শেষ বাঁশি’ মানতে নারাজ কবি। তাই কবির অঙ্গীকার—রাহুল আর শুনতে না পেলেও, তিনি ভালোবেসে যাবেন আজীবন। তাই তো তিনি লিখলেন, 

“এত সহজে তো নিভবে না এই চিতা!
আমরা বইব এই আগুনের ভার।
খেলার ছলেও মানবো না শেষ বাঁশি
এই তো শাস্তি, তুমি না-ই শোনো আর
যতদিন আছি, বলে যাব ‘ভালবাসি’...”

 

 

&t=2069s