বাংলা ধারাবাহিকের জনপ্রিয় মুখ৷ সম্প্রতি তাঁকে 'রাধুনী' নামের রান্নার শো সঞ্চালনা করতে দেখা যাচ্ছে৷ পর্দায় মেয়ে, বউ সব রূপেই তিনি পরিচিত, কিন্তু বাস্তবে সুদীপ্তা কেমন? মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন? মাতৃদিবসে আজকাল ডট ইন-কে মায়ের কথা বললেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা ব্যানার্জি। নিজের মা নয়, বরং সুদীপ্তার কথায় উঠে এল মা-মেয়ে দুই প্রজন্ম, দুই সময়কাল, মেয়েদের লড়াই, মায়েদের লড়াইয়ের কথা৷ শুনলেন সায়নী মুখার্জি।


আপনার জীবনে 'মা' শব্দটার অর্থ কী?

সুদীপ্তা: মা মানে আমার অস্তিত্ব (existence)। মা ছাড়া তো আমি কিছুই না, মা না থাকলে পৃথিবীটাই দেখতে পেতাম না। আমার সব থেকে প্রিয় দুজন মানুষ ছিলেন বাবা এবং মা। বাবা ২০২৩ সালে চলে গেছেন, এখন মাকে ভাল রাখাটাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। মায়ের কোনও বিকল্প হয় না। 

মায়ের হাতের কোন রান্নাটা সব থেকে প্রিয়?

সুদীপ্তা: মা আসলে সব রান্নাই খুব ভালো করেন। তবে সেমাইয়ের পায়েস, এঁচোড়-চিংড়ি এবং মাছের যেকোনও পদ মা দুর্দান্ত বানায়। আমি মাংস খাই না, তাই সেটা বলতে পারব না।

ছোটবেলা থেকে আমরা দেখে এসেছি মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এখন সময় বদলেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কি মা মানেই রান্নাঘরের দায়িত্ব নিতেই হবে?

সুদীপ্তা: রান্নাটা একটা শিল্প (art)। আমরা মায়ের হাতের রান্না খেয়েই বড় হয়েছি। এখন মায়ের বয়স হয়েছে, তাই আমরা তাকে আর অত দায়িত্ব নিতে দিই না। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, মা নিজের হাতেই রান্না করতেন। এখন আমি বিবাহিত, তাই মায়ের কাছে থাকা খুব কম হয়। দুর্গাপুজোর সময় যখন যাই, তখন মায়ের হাতের আলু ভাতে-ভাত, ডিম সিদ্ধ আর ডাল সিদ্ধই আমার কাছে অমৃত মনে হয়। লক্ষ্মী পুজো বা জন্মাষ্টমীর মতো বিশেষ দিনগুলোতে মা আজও নিজের হাতেই সব ভোগ রান্না করেন। তবে এখন  মা মানেই রান্না করতেই হবে সেটা হয়তো না। 

 মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সব থেকে বড় শিক্ষা (lesson) কী?

সুদীপ্তা: দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যাওয়া, দিন তোমারও আসবে। মা সারাজীবন বলে গেছেন, কখনও বলবে না যে আমার এটা নেই, বলবে আমি চেষ্টা করছি। সততা আর লড়াই করার মানসিকতাটাই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সব থেকে বড় শিক্ষা।

মাতৃত্বেই কি নারীর পূর্ণতা?

সুদীপ্তা: মাতৃত্ব এখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটা সিদ্ধান্ত (individual decision)। আমি মা হব কি হব না সেটা সম্পূর্ণ আমার এবং আমার পরিবারের সিদ্ধান্ত। পূর্ণতা পাওয়ার জন্য মা হওয়াই জরুরি নয়, একটা বাচ্চাকে দত্তক (adopt) নিয়েও বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের (NGO) সঙ্গে যুক্ত হয়েও পূর্ণতা পাওয়া যায়। তবে নিজে মা হওয়া অবশ্যই একটা বড় প্রাপ্তি।

সুদীপ্তা মা হলে কি কড়া মা হবে? 

সুদীপ্তা: একদমই নয়৷ আমি ছোট থেকে দেখতাম মা শাড়ি পরতেন। আমি মাকে বলেছিলাম মা তুমি সালোয়ার পরো না কেন? মা বলেছিলেন, এখানে সকলে শাড়িই পরেন৷ আমি হাওড়া শিবপুরে বড় হয়েছি৷ সেই সময় আমার মাকে আমি শাড়ি ছাড়াও আরও অনেক কিছু যেগুলো কমফর্টেবল সেগুলো পরিয়েছি৷ এখন তো সময় অনেক এগিয়েছে৷ আমাদের হাতে ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আছে৷ আমার বাচ্চা হলে এমনিই সে নিজেই অনেক কিছু শিখে নেবে৷ হয়তো আমাকেই এসে এটা বলবে, একী তুমি এটা জানো না!  

মার খেয়েছ?  

সুদীপ্তা: ও বাবা! খুব মার খেয়েছি। 

কী কী দুষ্টুমি করতে বলে মা মারত?  

সুদীপ্তা: পড়তাম না একদম। মা বলত, চিৎকার করে পড় যেন রান্নাঘর থেকে শুনতে পাই৷ ভীষণ দুরন্ত ছিলাম৷ খেলতে গিয়ে পড়ে যেতাম৷ কেটেকুটে যেত, তখন প্রচুর চড় থাপ্পড় খেয়েছি৷ কিন্তু বাবা মেয়ে অন্তপ্রাণ ছিল৷ 

সেইসময় মায়েরা কি সংসারের চাপে অবহেলিত হয়েছেন? 

সুদীপ্তা: দেখো, আগেকার দিনে ধারণা ছিল, একজন মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই সে শুধু রান্না করবে, সংসার করবে, বাচ্চা মানুষ করবে৷ সে নাচ গান চাকরি কিছুই করতে পারবে না। যদিও সকলে নন, কিছু কিছু পরিবার ভীষণ রক্ষণশীল ছিল৷ আমার বাবা খুবই উন্নতমনস্ক ছিলেন৷ বাবা মাকে গান শেখানোর জন্য টিচার রেখেছিলেন৷ বহু বছর মা গান শিখেছেন৷ আমরাও শিখেছি৷ বাবা নিজেও খুব ভাল গান গাইতেন৷ আমার পরিবারে আমি অবহেলিত হতে দেখিনি৷ কিন্তু এটা ঠিক, অনেক পরিবারেই মায়েরা অবহেলিত৷ এখন ‘রাঁধুনী’ সঞ্চালনা করতে গিয়েও দেখি অনেক পরিবারেই মেয়েরা মায়েরা বঞ্চনার শিকার৷ সন্তানের মধ্য দিয়ে তাঁরা সেই স্বপ্নপূরণ করতে চান৷ অনেকের ক্ষেত্রে আর্থিক টানাপড়েনও থাকে৷ এখন তো বাবা মায়েরাও সচেতন৷ সুযোগ আগের থেকে অনেক বেশি৷ মেয়েদের চেষ্টাটা চালিয়ে যেতেই হবে। কিছু বাধা আসে,থাকবেও কিন্তু তারই মধ্যে চেষ্টা করাটা খুব দরকার৷ 

বিয়ের পরে সুদীপ্তার জীবনে কি কিছু বদল এসেছে?  
সুদীপ্তা: আমি ১৪ ঘণ্টা বাড়ির বাইরে থাকি৷ তিনবছর বিয়ে হয়েছে আমার৷ আমি ভরপুর কাজ করি৷ এটা শ্বশুরবাড়ির সাপোর্ট ছাড়া পারতামই না। আমি একটা বাড়ির বউ, কিন্তু আমি বাড়িতে কোনও কাজই করি না৷ এখন হয়তো পারছি এভাবে৷ ভবিষ্যতে হয়তো দায়িত্ব বাড়বে, বয়স বাড়লে দায়িত্ব বেড়ে যায়, তখন হয়তো এভাবে পারব না। আমি যেমন এখন আমার মাকে বলি, নিজের মতো থাকো, খাও ঘুরে বেড়াও। 

শাশুড়িমা কখনও মা হতে পারেন না, কী বলবে ?

সুদীপ্তা: এটা একটা প্রবাদবাক্যের মতো হয়ে গিয়েছে। আমি মনে করি তুমি দুনিয়াটাকে যেভাবে দেখবে সেটাই সত্যি। বিয়ের পর একটা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। কিছু কিছু অসুবিধাও হয়৷ সবকিছু আলাদা৷ কিন্তু আমি এখন এই পরিবারের সদস্য৷ আমার বর, শাশুড়িমা, শ্বশুরমশাই বা ননদ—সবাই এখন আমার পরিবার। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গায় আলাদা। সম্মান করলে তবেই সম্মান পাওয়া যায়। কেউ কারও মতো হতে পারে না। মায়ের জায়গা মায়েরই থাকে৷ সেভাবে দেখতে গেলে তো এটাও বলতে হয়, বউ কি মেয়ে হতে পারে? প্রত্যেকের কিছু খারাপ ভাল থাকে, পছন্দ অপছন্দ আলাদা হবে, একসঙ্গে থাকার জন্য কারও উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়৷ একে অপরকে বোঝা আর পারস্পরিক সম্মানটা জরুরি৷ 

কোনও চরিত্রে অভিনয় করার জন্য মায়ের প্রশংসা পেয়েছ? 
সুদীপ্তা: মা প্রশংসা করে না সেভাবে৷ খুব বেশি হলে বলবে ভাল৷ ব্যাস এটুকুই৷ তবে আমার জন্য আমার মা খুব লাকি৷ অনেক দিন ধরে হয়তো পেমেন্ট আটকে আছে, বা ভাল কাজ পাচ্ছি না আমার মায়ের কাছে গেলে সেটা হয়ে যাবে৷ হবে মানে হবেই আমার মা এতটাই লাকি আমার জন্য।

ছুটি পেলে নিজেকে সময় দাও না পরিবারের জন্য সময় দাও? 
সুদীপ্তা: ফ্যামিলি৷ আমি খুব ল্যাদখোর৷ প্রতিদিন ভাবি শুটিঙের আগে এক্সারসাইজ করে যাব৷ কিন্তু আমি ঘুম থেকেই উঠি কলটাইমের আধ ঘণ্টা পরে৷ ছুটি পেলে তাই পুরোটাই বাড়িতে থাকার চেষ্টা করি৷ 


 

মায়ের কোন অভ্যাসটা নিজের মধ্যে অজান্তেই চলে এসেছে বলে মনে হয়?

সুদীপ্তা: মা সাজতে খুব ভালবাসেন, আমিও খুব ভালবাসি। এছাড়া মা শাড়ি পরতে খুব পছন্দ করেন। আমিই মাকে সালোয়ার পরা শিখিয়েছি। আর একটা অভ্যাস মায়ের থেকে পেয়েছি সেটা হল অকারণে সৌখিন জিনিস কিনে টাকা নষ্ট করা!

মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে কে আগে মিটমাট করে?

সুদীপ্তা: মা একটু জেদী (stubborn)। তাই বেশিরভাগ সময় আমিই ফোন করে মিটমাট করি। মা রাগ করে থাকলেও হয়তো ছ'-সাত ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে, তখন আবার নিজেই খোঁজ নেবে, আমি শুটিং থেকে বাড়ি ফিরলাম কি না। 

মাকে নিয়ে সিনেমা বানালে নাম কী হবে?  
সুদীপ্তা: মা। 

 রাঁধুনী সঞ্চালনা করতে গিয়ে কোনো বিশেষ স্মৃতি আছে?

সুদীপ্তা: আমি গত ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে রাঁধুনী সঞ্চালনা করছি। এটা আমার কাছে একটা বড় আশীর্বাদ। ১ মে আমাদের একটা এপিসোড ছিল যেখানে একজন মহিলা এসেছিলেন, তিনি চা বিক্রি করেন৷ তিনি যেভাবে ভোর থেকে লড়াই করে নিজের মেয়েকে ভাল স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছেন, তা দেখে আমি সত্যিই অনুপ্রাণিত (inspired) হয়েছি। কত মানুষের কত লড়াই থাকে৷ সেই লড়াই সেই জীবনকে জানতে পারছি ‘রাঁধুনী’র জন্য৷