ফুটবল যে কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে নিষ্ঠুর খেলা, তা আরও একবার প্রমাণ করল দোহার সবুজ গালিচা। ম্যাচের ঘড়িতে তখন ৮০ মিনিট। মিশরের বিরুদ্ধে ০-২ গোলে পিছিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্যালারি থেকে শুরু করে টিভির সামনে বসা কোটি কোটি নীল-সাদা সমর্থকের চোখে তখন জল আর মুখে স্তব্ধতা। মনে হচ্ছিল, টুর্নামেন্ট থেকে আর্জেন্টিনার বিদায় শুধু সময়ের অপেক্ষা, আর সেই সঙ্গে হয়তো চিরতরে থমকে যেতে চলেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসি অধ্যায়ও।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই কোটি কোটি আতঙ্কিত ও দমবন্ধ হয়ে আসা সমর্থকদের দলেই ছিলেন দুই বাংলার অন্যতম শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। খেলা শেষে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনিও। সমাজমাধ্যমে অকপটে স্বীকার করেছেন, ভয় পেয়েছিলেন তিনিও! ম্যাচের প্রথমার্ধে মেসির পেনাল্টি মিস যখন আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছিল, তখন আর পাঁচজন সাধারণ ভক্তের মতোই চঞ্চলের বুকেও কাঁপন ধরেছিল।

কিন্তু নাটকীয়তার তখনও অনেক বাকি ছিল। আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিল—‘ইমপসিবল ইজ নাথিং’।
যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই ত্রাণকর্তা হয়ে এলেন ক্রিস্তিয়ান রোমোরো। তাঁর শরীর ছুঁড়ে দেওয়া এক অবিশ্বাস্য ডাইভিং হেড কাঁপিয়ে দিল প্রতিপক্ষের জাল। ব্যবধান কমল, আর্জেন্টিনার ধমনীতে ফিরল রক্তস্রোত। এরপর পেনাল্টি মিসের দায় যার কাঁধে ছিল, সেই চেনা জাদুকরই খোলস ছেড়ে বেরোলেন চরম মুহূর্তে। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে আসা বলটিকে ধরে ডান পায়ের দুর্দান্ত এক হাফ-ভলিতে বল জালে জড়ালেন লিওনেল মেসি। স্কোরবোর্ড ২-২! মুহূর্তে বদলে গেল দোহার আকাশ। যে মেসি ডুবিয়েছিলেন, সেই মেসিই যেন সঞ্জীবনী সুধা এনে দিলেন দলে। নাটকের আসল ক্লাইম্যাক্স তখনও বাকি ছিল। ম্যাচ গড়াল অ্যাডেড টাইমে। ঘড়িতে তখন অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিট। ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত এক ক্রস বাড়ালেন লাওতারো মার্তিনেজ। বক্সের ঠিক মাঝখানে বাঘের মতো ওত পেতে ছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। বাতাসে ভেসে আসা বলটিতে মাথা ছোঁয়ালেন তিনি, আর বল সোজা গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জড়াল জালে। ৩-২! অসম্ভব শব্দটাকে ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলল আলবিসেলেস্তেরা। আর এই কারণেই হয়তো তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ম্যাচ শেষ হওয়ার শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত এই জাত পারফর্মারদের খাতা থেকে মুছে ফেলতে নেই। তারা ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠতে জানে।

আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য জয়ের পর ওপার বাংলার তারকা অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী কেবল নিজের দলের জয় উদযাপনই করেননি, বরং প্রতিপক্ষ মিশরের লড়াকু ফুটবলকেও কুর্নিশ জানিয়েছেন। ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ও রাজা পুরুর কাহিনীর উদাহরণ টেনে তিনি মিশরকে বীরের সম্মান জ্ঞাপন করেন। ফুটবল মাঠে মিশর যেভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেপে ধরেছিল, তা চঞ্চলের চোখে এক অনন্য স্পোর্টিং স্পিরিট।

 

এই জয়ের পর আগামী শনিবার কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। কাগজ-কলমে সেমিফাইনালের রাস্তা এখন অনেকটাই মসৃণ। তবে এই ম্যাচ প্রমাণ করল, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত এই পারফর্মারদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায় না।

লৈওনেল মেসি এবং তাঁর আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে টিকে রইল। আর ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেসি টুর্নামেন্টে থাকা মানেই বিশ্বকাপের ‘সেনসেক্স’ ঊর্ধ্বমুখী—মাঠে দর্শক আসবে, স্পন্সররা থাকবে আর ফুটবলপ্রেমীরা বুকভরে নীল-সাদা স্বপ্নের অক্সিজেন নিতে থাকবে।