অনীক দত্তের 'বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর মতো বহুল আলোচিত ছবির অন্যতম চিত্র্যনাট্যকার-পরিচালক উৎসব মুখার্জি গত ২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে নিখোঁজ। ব্যাঙ্কের কাজে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। বাড়ি থেকে দুপুরবেলা ব্যাঙ্কের কাজে যাবার জন্য বেরিয়েছিলেন উৎসব। তারপর থেকেই আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আনন্দপুর থানায় 'মিসিং ডায়রি' করেছেন পরিচালকের স্ত্রী মৌপিয়া ব্যানার্জি। ১৮ দিন হয়ে গেল এখনও পর্যন্ত কোনও খোঁজ মেলেনি পরিচালকের। স্বামীর চিন্তায় অস্থির স্ত্রী মৌপিয়া। এবার সমাজমাধ্যমে বিস্ফোরক তথ্য ভাগ করলেন মৌপিয়া।


তিনি লেখেন, '১৮ দিন হয়ে গেল উৎসব নিখোঁজ। ও কোথায় আছে, কেমন আছে, সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই নেই। পুলিশ বলছে তদন্ত চলছে, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, আমার শরীর আর মনের অবস্থা ততই ভেঙে পড়ছে। আমার এখন কিছু কথা লিখে রাখা খুব দরকার; যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তবে এই সত্যিগুলো আর কেউ কোনওদিন জানতে পারবে না। পুলিশ পুরো ঘটনাটা জানে। কিন্তু তারা সত্যিই এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে কি না, আমি জানি না।'

তিনি আরও বলেন, '২০২৪ সালের আগস্ট মাসে উৎসবের সঙ্গে আমার পরিচয়। কাজের সূত্রেই আলাপ, তারপর আমরা খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠি। আমাদের সম্পর্কটা ছিল একে অপরের প্রতি নির্ভরতা আর সাহচর্যের। আমি সাধারণত অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না, নিজের জীবন সামলাতেই আমি ব্যস্ত থাকি। বিপদ না বুঝলে আমি কাউকে অকারণে প্রশ্ন করি না।
প্রথমদিন থেকেই উৎসব আমাকে বলেছিল ওর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত না হতে। আমি ওর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েছিলাম। আসলে সব সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উৎসব আমাকে জানায় কেন ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এতটা আতঙ্কিত। ও বলেছিল, ২০১৯ সাল থেকে ওর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রচুর ভুয়ো আইডি থেকে আক্রমণ শুরু হয়। ও কোনও ছবি দিলেই শত শত ভুয়ো অ্যাকাউন্ট থেকে নোংরা মন্তব্য করা হতো। একটা মুছলে আরও দশটা আসত। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। ও যে প্রযোজনা সংস্থায় কাজ করত, তাদের নিয়ে সাইবার ক্রাইমে অভিযোগ জানালেও কোনও লাভ হয়নি। এরপর আক্রমণগুলো ব্যক্তিগত হতে শুরু করে। কোনও নারী সহকর্মী বা বন্ধুর সঙ্গে ছবি দিলেই সেই সব ভুয়ো আইডি থেকে কুৎসিত আক্রমণ চলত। ফেসবুক থেকে শুরু করে ইনস্টাগ্রাম, ইন্টারনেটের সব জায়গায় ওকে টার্গেট করা হয়েছিল।'

মৌপিয়া লেখেন, 'কেউ একজন শত্রুতা করে ওর জীবন ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল। ভয়ে উৎসব নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। ও একা হয়ে যায়, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার থেকে দূরে সরে আসে। ছবি তোলা বা লোকসমক্ষে অনুষ্ঠানে যাওয়া ও বন্ধ করে দেয়। এতে ওর কেরিয়ারের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ও মন খুলে কাজ করতে পারছিল না, কথা বলতে পারছিল না। অনেক প্রজেক্ট ও ছেড়ে দিয়েছিল। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল শুধু কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষের মাঝে।
আমি সব শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং ওকে রুখে দাঁড়াতে বলি। ওর বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই যখন আবার আক্রমণ শুরু হয়, আমি ওকে পরামর্শ দিই যেন ও লুকিয়ে না থেকে সবাইকে সবটা জানায়। ও ওর ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল ছবি বদলে দিয়ে লেখে যে ও সাইবার আক্রমণের শিকার। ও একটি ভিডিও করে সবাইকে সবটা জানায়। আমরা পুলিশের কাছে যাই এবং তাদের কথা মতো কাজ শুরু করি। কিন্তু তাতেও আক্রমণ থামেনি। আমাদের বিয়ের পর এই অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। আমাদের বিয়ের ছবির নিচে নোংরা মন্তব্য করা শুরু হয়। উৎসবের নামে একটা ওয়েবসাইট খুলে সেখানে আমাদের দু'জনকে নিয়ে কুৎসা রটানো হয়। উৎসবের নামে ভুয়ো ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল খুলে আমাদের বিয়ের ছবি দিয়ে নিয়মিত অপমানজনক পোস্ট করা হতে থাকে। আক্রমণকারী এমনও দাবি করে যে, আমি নাকি এই কয়েক বছর ধরে ওকে হেনস্তা করেছি! অথচ আমি ওকে চিনি মাত্র দু'বছর। আমি করপোরেট জগতের মানুষ, ২০২৪-এর মাঝামাঝি সময়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছি। এই জগতটাকে আমি এখনও ঠিকমতো চিনিও না। আমাকে বদনাম করার জন্য খুব কৌশলে দোষটা আমার ওপর চাপানো হয়েছিল। এই সবকিছু আমাদের ওপর খুব বাজে প্রভাব ফেলছিল। আমাদের কাজের জায়গায় ভাবমূর্তি বা ইমেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর আক্রমণকারী ঠিক সেখানেই আঘাত করছিল।'


তিনি আরও লেখেন, 'অদ্ভুত ব্যাপার হল, উৎসব নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এই আক্রমণকারীরা হঠাতই চুপ হয়ে গিয়েছে। পুলিশ সবটা জানে। উৎসবের হারিয়ে যাওয়ার পিছনে এই ঘটনার কোনো হাত আছে কি না, সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন পুলিশের। আমি ক্লান্ত, ভীত এবং ওর জন্য ভীষণ চিন্তিত। জানি না এই অবস্থায় আমি আর কতদিন নিজেকে সামলাতে পারব। আমার কী হবে জানি না, তাই খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ফেসবুকের মাধ্যমে সবটা জানিয়ে রাখলাম। পুনশ্চ: যারা ভাবছেন কেন ওর প্রোফাইল আর কভার ফটো বদলে গিয়েছে, তাদের জানাই যে ক্রমাগত আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে আমিই ওগুলো বদলে দিয়েছিলাম।'

মৌপিয়ার এই পোস্ট ঘিরে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে নেট পাড়ায়।