তালসারিতে শুটিং চলাকালীন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু টলিপাড়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর শুটিং সেটে নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর এই প্রেক্ষিতে পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র একগুচ্ছ কড়া ও জরুরি প্রস্তাব সামনে এনেছেন, যা তিনি 'নন-নেগোশিয়েবল' বলে উল্লেখ করেছেন।

শুভ্রজিৎ মিত্রের মতে, শুটিংয়ের নামে কোনওভাবেই শিল্পী বা টেকনিশিয়ানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়। বিশেষ করে জল, আগুন বা উচ্চতা, এই তিন ধরনের দৃশ্যের ক্ষেত্রে আলাদা করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জলাশয়ের কাছে বা জলের মধ্যে শুটিং হলে প্রত্যেক অভিনেতার জন্য প্রশিক্ষিত রেসকিউ কর্মী থাকা বাধ্যতামূলক বলে তিনি জানিয়েছেন। সেই কর্মীকে সবসময় অভিনেতার খুব কাছাকাছি থাকতে হবে, যাতে বিপদের মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করা যায়। শুধু তাই নয়, গভীর জলে শুটিং হলে স্পিডবোট প্রস্তুত রাখার কথাও বলেছেন পরিচালক, যাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সাহায্য পৌঁছে যায়।

আগুনের দৃশ্য নিয়েও শুভ্রজিৎ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। কোনও অভিনেতাকে সরাসরি বড় আগুনের সামনে দাঁড় করিয়ে শুটিং করা যাবে না। এই ধরনের দৃশ্যের জন্য প্রশিক্ষিত স্টান্টম্যান ব্যবহার করা বা ভিএফএক্সের সাহায্য নেওয়াই উচিত। পাশাপাশি শুটিং ফ্লোরে সবসময় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

উঁচু জায়গা থেকে শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও একাধিক সুরক্ষাবিধি মানার কথা বলেছেন পরিচালক। ১০ ফুটের বেশি উচ্চতায় কোনও দৃশ্য শুট করতে হলে হারনেস, সেফটি বেল্ট এবং নিচে কুশনিং প্যাড থাকা বাধ্যতামূলক। শুধু অভিনেতাই নয়, লাইট, ক্যামেরা বা আর্ট ডিপার্টমেন্টের যাঁরা উচ্চতায় কাজ করেন, তাঁদেরও একই নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনা উচিত।

একইসঙ্গে যে কোনও ঝুঁকিপূর্ণ শুটিংয়ের আগে একজন প্রশিক্ষিত সেফটি অফিসারের মাধ্যমে পুরো সেট পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন পরিচালক। তাঁর দাবি, শুধু নিয়ম বানালেই হবে না, সেগুলি ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা, তা নজরদারির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এই কারণেই তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ শুটিংয়ের দিনে শিল্পী সংগঠন ও টেকনিশিয়ান গিল্ডের প্রতিনিধিদের সেটে উপস্থিত থাকা উচিত। তাঁরা সরাসরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবেন। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে প্রযোজনা সংস্থা, চ্যানেল বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট টিমকে দায় নিতে হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকেও বিশেষ জোর দিয়েছেন শুভ্রজিৎ মিত্র। প্রতিটি আউটডোর শুটে ডাক্তার ও জরুরি ওষুধ থাকা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি, দুর্গম এলাকায় শুটিং হলে ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিক্যাল টিম রাখার কথাও বলেছেন তিনি।

পরিচালকের কথায়, এই নিয়মগুলি এখনও বাধ্যতামূলক না হলেও, তিনি তাঁর ছবি ‘অভিযাত্রিক’ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’-র শুটিংয়ে কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। তাঁর মতে, একটি দৃশ্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, কোনও মানুষের জীবনের থেকে বড় হতে পারে না। পরিচালক ফেসবুক পোস্টে নিরাপত্তার এই বিষয়গুলি উল্লেখ করে আর্টিস্ট ফোরাম এবং ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকে ট্যাগ করেছেন। 

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর এই দাবি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টলিপাড়ার অনেকেই মনে করছেন, এবার হয়তো সত্যিই শুটিং সেটে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গিয়েছে।