আশা ভোঁসলেকে আমি দিদি বলে ডাকতাম। যদিও আমার মায়ের বয়সী উনি, তবু। আর উনি আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করতেন। দিদি চলে গিয়েছেন, বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল, তবু এখনও আমার বিশ্বাস হয় না যে দিদি আর নেই। ওঁর মতো এমন ভার্সেটাইল গায়িকা নিজের কর্মজীবনে আমি খুব কমই দেখেছি। নয়ের দশকের একেবারে শুরুর দিক সেটা। দূরদর্শনে গুলজার সাহেবের বিখ্যাত পাপেট শো 'পোটলি বাবা কি'তে কাজ করছি। বোম্বে-কলকাতা নিত্য যাতায়াত করছি। বলিপাড়ার সঙ্গে অল্প অল্প পরিচিতি হচ্ছি। সেটা ১৯৯৪। কলকাতায় আমার বাড়িতে একটা ফোন এল -পরিচালক প্রকাশ ঝা-র। শুনে তো থমকে গিয়েছি। জানলাম, গুজার ভাই আমার কথা ওঁকে বলেছে। রাজি হলাম ছবিতে সুর দেওয়ার ব্যাপারে। গেলাম বোম্বে। তৈরি হল পাঁচটি গান। লিখলেন গুলজার, সুর দিলাম আমি। সুর শুনেটুনে প্রকাশ ঝা এবং গুলজার সিদ্ধান্ত নিলেন লতা মঙ্গেশকর অথবা আশা ভোঁসলে-কে দিয়েই গাওয়াতে হবে এই গান। শেষপর্যন্ত নাম ঠিক হল আশা-র।
গুলজার ভাই ফোনে বললেন আশা ভোঁসলেকে। কারণ আমাকে তখন কে চেনে! যাই হোক, আশা জানালেন আগে তিনি গান শুনবেন তারপর ঠিক করবেন তিনি তা গাইবেন কি না। দিনক্ষণ ঠিক হল ওঁর কাছে যাওয়ার। আমাকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ! প্রকাশ ঝা-র ওই ছবিটি ছিল গ্রাম-নির্ভর। আমার লোকসঙ্গীতের গানের যতটুকু অর্জিত ভাণ্ডার, তা থেকেই বের করে সুর দিয়েছিলাম। একটি গান শোনামাত্রই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন আশা। বাকিগুলো আর শোনাতে হয়নি। তার উপর গানগুলো লিখেছিলেন গুলজার তার উপর উনি নিজে আমাকে রেফার করেছিলেন, সুতরাং রাস্তা খানিক মসৃণ-ই ছিল। যাই হোক, রেকর্ডিং ডেট ঠিক হল। যদিও প্রথম দিনে উনি মিস করেছিলেন। অসুস্থ ছিলেন। সেটাও জানিয়েছিলেন রেকর্ডিংয়ের দিন, তা-ও অনেকটা পরে! আমরা ফোন করেছিলাম, ওঁর আপ্ত সহায়ক জানিয়েছিলেন আশার শরীর খারাপ। কী মুডি ভাবুন। নিজে জানাননি!
যাই হোক, সাহারা স্টুডিওতে সব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এদিকে সেদিন বাদে আর অন্য ডেট নেই সেখানে, সব বুকড। দিলীপসেন এবং সমীরসেন নামে সেই সময়ের খ্যাত সুরকার জুটি বুক করে রেখেছিলেন। অনুরোধ করাতে আমাদের একটি ডেট দিয়েছিলেন রেকর্ডিংয়ের এবং নিজেরাও এসেছিলেন আশা'দির রেকর্ডিং শুনতে! আমার সুরে, আমার অ্যারেঞ্জমেন্টে আশা ভোঁসলে গেয়েছেন, এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।
ধীরে ধীরে আশা’দির সঙ্গে আমার সম্পর্ক সুন্দর হল। এরপর পঞ্চমদার সুরের বেশ কিছু জনপ্রিয় হিন্দি গান বাংলা অনুবাদ করে রেকর্ডিং হয়েছিল। গেয়েছিলেন আশাজি-ই। সুর অ্যারেঞ্জমেন্টের জন্য কিন্তু আশাজি আমার নাম-ই প্রস্তাব করেছিলেন। ফলত, তাঁর সঙ্গে সেই প্রজেক্টটিও আমি করেছিলাম। বেশ অনেকদিন ধরে কাজটা হয়েছিল। পার্ক হোটেলে ছিলেন আশা দিদি। সেই সময়ে একটি ঘটনা ঘটেছিল। শেষ যেদিন গান রেকর্ডিং, সেদিন ওঁর গলাটা ঠিক লাগছিল না-সেটা ওঁর ব্যক্তিগত মত ছিল। বেশ কয়েকবার রেকর্ড করলেন আর প্রতিবার রেকর্ডিং শেষে বেজায় বিরক্ত হচ্ছিলেন, নিজেকে গালাগাল করছিলেন! প্যাশনটা ভাবুন। শেষে হাল ছেড়ে বলেছিলেন –“দাদা, আজ ছোড় দিজিয়ে, দুসরে দিন কর লেঙ্গে।”এটুকু বলেই কিন্তু রেকর্ডিং স্টুডিও ছেড়ে চলে যাননি তিনি। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর সেই রেকোর্ডিংগুলো ডিলিট করালেন! প্যাশনটা ভাবতে পারছেন। আর একটা কথা বলে দিই, বাইরে যা-ই শোনা যাক, কোনওদিনও নিজের দিদির সম্পর্কে একটি কটু কথা কিংবা কটাক্ষও কিন্তু আশাদি করেননি আমার সঙ্গে।
এরপর বোম্বেতে দিদির সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে। একবার ওঁর বাড়িতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের হাতে ইলিশ মাছের ঝোল রেঁধে খেয়েছিলেন। অপূর্ব রান্না করতে পারতেন। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেও দেখাও করিয়েছিলেন।
তাই সব মিলিয়ে আশা ভোঁসলে আমার কাছে কেবল সুরের জাদুকর নন, তিনি এক মায়াভরা হৃদয়ের মানুষ। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আর তাঁর কণ্ঠস্বর আমাদের প্রজন্মের কাছে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ওঁকে মনে না রাখা ছাড়া উপায় নেই আমাদের।















