বেঁচে থাকলে এদিন তাঁর বয়স হত ১০৩। তিনি, পরিচালক মৃণাল সেন। এই বিশেষ দিনে কিংবদন্তি এই পরিচালকের সঙ্গে নিজের আত্মিক ও পেশাদার সফরের স্মৃতিচারণ করলেন দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। মৃণাল সেনের জীবননির্ভর ছবি ‘পদাতিক’-এ তাঁর চরিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তি মৃণাল সেনের আদর্শ কীভাবে চঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে এক আবেগঘন খোলা চিঠি লিখলেন অভিনেতা।


“মৃণাল সেনকে আমার চেনা তাঁর কাজের মাধ্যমে। অর্থাৎ তাঁর ছবির মাধ্যমেই। তাঁর সেই কাজের ধরন, ছবির বিষয় দেখেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ি প্রথম থেকেই। তাঁর ছবির বিষয়বস্তুরা যে যে গলিঘুঁজির অন্দরে ঘোরাফেরা করেছে -জীবনের গল্প, মানুষের অধিকার আদায়ের গল্প, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের গল্প...আর এইসব বিষয় নিয়ে কিন্তু খুব বেশি পরিচালক ছবি বানান না। তখনও খুব একটা বানাতেন না। বেশিরভাগই বাজারচলতি বিষয় যা ট্রেন্ডি ছিল তাতেই মনযোগ দিতেন। এই যে আলাদা একটা পরিসর, ঠিক সেখান থেকেই মৃণাল সেনের কাজের বিষয়ে দুর্নিবার একটা আকর্ষণ জন্মায়। সম্মান জন্মায়। ভালবাসা বাড়তে থাকে। সময়, বয়স, অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থ বদলে বদলে গেছে। আরও শাখাপ্রশাখা ছড়িয়েছে চিন্তার গভীরে। 

 

এবার যখন মৃণাল সেনের জীবনীনির্ভর ছবি করতে গেলাম, ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে যখন আরও চেনার সুযোগ এল তখন কিন্তু এক লহমায় তাঁর প্রতি আমার ভালবাসা-সম্মান কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেল। জানলাম, তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে যে দর্শনের কথা তিনি দর্শককে বলতেন একেবারে ঠিক সেটাই তিনি ধারণ করতেন। ওই দর্শনের পথে চলা জীবনটাই তিনি প্রবলভাবে যাপন করতেন। সুতরাং, পরিচালকের থেকেও মানুষ মৃণাল সেনকে আরও বেশি পছন্দ করা শুরু করলাম। কারণ বহু মানুষের কর্মজীবনের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের মিল পাওয়া যায় না। ওঁর যেত এবং ভীষণভাবে যেত। সেই মানুষটি নিজে যা ছিলেন, যা পছন্দ করতেন, যা বিশ্বাস করতেন সেটাই তাঁর কাজের মাধ্যমে পর্দায় ফুটে উঠত। নিজের নীতি-আদর্শ থেকে ছিটকে যাননি। অর্থাৎ ব্যক্তি এবং পরিচালক মৃণাল সেন একেবারে এক মানুষ। এই বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গিয়েছে। 


আর একটি কথা বলতে চাই। মৃণাল সেনের একটি বিষয়ের সঙ্গে নিজের একটি ব্যাপার ভীষণভাবে উপলব্ধি করেছি। বিষয়টি একটু ভেঙেই বলি। আসলে, একজন মানুষ তো তাঁর আদর্শকে ধারণ করে তাঁর কাজকর্মে, জীবন যাপনে। অন্তত চেষ্টা করে। আমিও তাই করি। মৃণাল সেনের এই যে সহজ অথচ দৃঢ়ভাবে জীবন যাপন করা এটা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছিল। মৃণাল সেনের এই আদর্শটুকু আমি লালন করি। ব্যক্তিজীবনে আমি একেবারেই বিলাসবহুলভাবে জীবনযাপন পছন্দ করি না। অনেকটাই দূরে থাকি। আর তা কিন্তু জোর করে নয়, সহজাতভাবেই। চাইলেই জীবনটাকে অন্যভাবে যাপন করতে পারতাম তবে তখন তার মধ্যে সত্যতা থাকত না। গোটাটাই অভিনয় হয়ে যেত। আর এমনিতেও তো আমি পর্দায় অভিনয় করি সবসময়, ব্যক্তিজীবনে তাই সেটা করাটা পছন্দ করি না। চেয়েছি, আমার অভিনয়টা যেন শুধু ওই একটি জায়গাতেই আটকে থাকুক। তাই নিজের জীবনে আমি নিজের ঢংয়ে কাটাতে পছন্দ করি, ভণিতাহীন জীবন যাপন করি, সহজভাবে করি। আসলে, যে মানুষদের আদর্শ আমার পছন্দ হয়, সেই আদর্শের চর্চা করি। তাঁদের মতো হওয়া তো সম্ভব নয়, তবে তাঁদের আদর্শগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। 

 

 

শিল্পী: চঞ্চল চৌধুরী 

এই ফাঁকে আর একটা কথা বলতে চাই। অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, আমার প্রিয় মৃণাল সেনের ছবি কোনটি? তাঁদেরকে জানাই, আলাদা করে কোনও একটি ছবি নয়। আগে তো দেখেছিলাম, যখন ওঁর জীবনীনির্ভর ছবি করতে গিয়েছিলাম তখন ফের সব ক'টি ছবি দেখেছিলাম। আসলে, ওঁর ছবি যেমন এক একটি সময়ে দলিল, তখনকার জীবন সম্পর্কে যেমন পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় ঠিক তেমনই কিন্তু ব্যক্তি মৃণাল সেন-কেও দিব্যি বোঝা যায়। তাঁর কাজের আর নিজের মধ্যে কোনও পাঁচিল তোলা নেই।  ওঁর সঙ্গে কোনওদিন দেখা হয়ে গেলে, এটাই বলতাম আপনার জীবন দর্শন অনুসরণ করার চেষ্টা করব। 

 

 

   শিল্পী: চঞ্চল চৌধুরী 

 

শেষ করার আগে আপনাদের পাঠকদের একটি ছোট্ট উপহার দিতে চাই। চারুকলার ছাত্র ছিলাম, আজও তাই রং-তুলি-পেন্সিল আমার হৃদয়ের খুব কাছের। সময় পেলে পছন্দের মানুষ, ব্যক্তিত্বদের আমি এনেকে ফেলি। মৃণাল সেন-কেও এঁকেছিলাম, নিজের মতো করেই। সেই ছবি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। মৃণাল সেনের জন্মবার্ষিকীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।