ব্যস্ত শহর। তাড়াহুড়োর বিকেল। কলকাতার ব্যস্ত বিকেলগুলো সাধারণত আলাদা করে মনে থাকে না। ট্রামলাইন পেরিয়ে ধুলো উড়ছে, ফুটপাথে ভিড় জমেছে, দোকানে দোকানে আলো জ্বলছে—সবই যেন প্রতিদিনের পুনরাবৃত্তি। তবু ঠিক এই রকম এক দিনেই ঘটে যায় এমন কিছু, যা শহরের কোলাহল ভেদ করে মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়।

পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত সম্প্রতি এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।ঘটনাস্থল, কলকাতার একটি সাধারণ কেকের দোকান। তিনি ঢুকেছিলেন অল্প কিছু খাওয়ার জন্য। সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ভদ্রলোক—সাদা শার্ট, কলার সামান্য হলদেটে। চেহারায় অদ্ভুত এক সংযম, যেন দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিখে নিয়েছেন কীভাবে নিজেকে ছোট করে রাখতে হয়, যাতে কারও অসুবিধে না হয়।

সেই ভদ্রলোক একটি আনারসের কেক কিনছিলেন।  অতি পরিচিত আনারসের কেক, উজ্জ্বল হলুদ আইসিং দেওয়া। দোকানের কাউন্টারের তরুণী জানতে চাইলেন, কেকের ওপর কোনও নাম লিখতে হবে কি না। ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। কিন্তু মেয়েটি হাল ছাড়ল না। হেসে জিজ্ঞেস করল, “কার জন্মদিন, জেঠু?”প্রশ্নটি যেন একটু বেশি সোজাসাপটা ছিল। ভদ্রলোক চশমা সামলে নিয়ে বললেন, “আমার।” খুব নিচু গলায়, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা করে।

সেই মুহূর্তে সময় যেন খানিক থমকে যায়। মেয়েটি এক সেকেন্ডের জন্য চিপ করে যায়। তারপর পেছনে কাজ করা দুই ছেলেকে ডাক দেয়। দোকানের ভেতরে ছোট্ট এক আয়োজন তৈরি হয়। কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই, কোনও পরিকল্পনা ছাড়া। কয়েকজন মিলে গাইতে শুরু করে ‘হ্যাপি বার্থডে’। সুর নিখুঁত নয়, তাল মেলেনি পুরোপুরি, কিন্তু আন্তরিকতায় কোনও খামতি ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রলোক লজ্জায় লাল হয়ে যান। কখনও চোখ নামিয়ে জুতোর দিকে তাকিয়ে থাকতে শুরু করেন, কখনও বা কেকের বাক্সের দিকে। চোখ তুলে কারও দিকে তাকাতে যেন সংকোচ হচ্ছিল। তবু সেই অপ্রস্তুতির ভেতর দিয়ে একটুখানি হাসি ফুটে উঠেছিল।

সবকিছু শেষ হলে তিনি চুপচাপ টাকা নিলেন, বাক্স হাতে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু বেরোনোর সময় তাঁর কাঁধের ভঙ্গি বদলে গিয়েছিল কি? হয়তো সামান্য। হয়তো না। তবু যারা দেখেছিল, তাদের মনে হয়েছিল—মানুষটি ঢুকেছিলেন একা, কিন্তু বেরোলেন একটু কম একা হয়ে।

আসলে, এই শহরে একাকীত্ব খুব চেনা বিষয়। বহু মানুষ আছেন, যাঁদের ব্যক্তিগত দিন-তারিখের গুরুত্ব জানানোর মতো কেউ থাকে না। জন্মদিনও কখনও নিঃশব্দে কেটে যায়। কিন্তু সেদিন কয়েকজন অচেনা মানুষ কয়েক মিনিটের জন্য সেই নীরবতাকে ভেঙেছিল।

ঘটনাটি বড় কিছু নয়। কোনও নাটকীয় মোড় নেই, নেই আবেগঘন সংলাপ। কিন্তু ঠিক এই ছোট ছোট অপ্রস্তুত মুহূর্তগুলিই মনে করিয়ে দেয়—মানবিকতা এখনও বেঁচে আছে। খুব জাঁকজমক করে নয়, নিঃশব্দে।হয়তো সেই মানুষটি সেদিন বাড়ি ফিরে কেক কেটেছিলেন একাই। হয়তো কাউকে ফোন করেছিলেন, হয়তো করেননি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দোকান থেকে বেরোনোর সময় তাঁর দিনটা আর আগের মতো ছিল না।

শহর কখনও কখনও এমনই, ভিড়ের মধ্যে থেকেও হঠাৎ করে একটু জায়গা করে দেয় কারও জন্য। আর সেই জায়গাটুকুই হয়তো যথেষ্ট।কোলাহলের মধ্যে ঢুকে পড়ে এক নিঃশব্দ মুহূর্ত যা হয়তো কারও চোখে পড়ে না, কিন্তু মনে থেকে যায় অনেকদিন।