বিগত দুটো মাস ধরে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল নেটপাড়া। ইনস্টাগ্রামের দেওয়ালে নেই কোনও নতুন ছবি, নেই চেনা সেই চওড়া হাসির ঝলক। ‘দ্য কপিল শর্মা শো’ খ্যাত জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুমনা চক্রবর্তী আচমকাই যেন কর্পূরের মতো উড়ে গিয়েছিলেন সামাজিক মাধ্যম থেকে। অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন ৩৮ বছর বয়সী অভিনেত্রী। তবে কোনো গ্ল্যামারাস ফটোশুট দিয়ে নয়, বরং হাসপাতালের বিছানা আর পেটের তিনটি গভীর ক্ষতচিহ্নের গল্প নিয়ে ওলটপালট করে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়ার চেনা সমীকরণ। উন্মোচন করলেন এক ‘ভয়াবহ’ সত্যের—যা গত দু-মাস ধরে তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই রেখেছিল ‘পাতালপুরী’তে।
“গত দুটো মাস আমি একটা পাথরের নীচে বেঁচে ছিলাম”, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিরেই সুমনার প্রথম স্বীকারোক্তি। গত ৪ মে এক প্রকার নিঃশব্দেই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেছিলেন অভিনেত্রী। কারণ? বিগত কয়েক বছর ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করেও যে রোগটাকে তিনি বাগে আনতে পারছিলেন না, তা আচমকাই মারাত্মক রূপ ধারণ করে। চিকিৎসকদের ভাষায় যার নাম স্টেজ ফোর এন্ডোমেট্রিওসিস (Stage IV Endometriosis)।
২০২১ সালে প্রথম এই যন্ত্রণাদায়ক জরায়ুর রোগ ধরা পড়ে সুমনার। বছরের পর বছর ওষুধ আর নিয়মের বেড়াজালে একে আটকে রাখলেও, গত মে মাসে রোগটি শরীরের ভেতর থাবা চওড়া করে। বাধ্য হয়েই ছুরি-কাঁচির নিচে সঁপে দিতে হয় নিজেকে। সুমনা অকপটে লিখেছেন, “গত দুটো মাস কেটেছে নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে জোড়া লাগাতে। আজ আমি জোর গলায় বলতে পারি, আমি ভাল আছি। খুব ভাল আছি।”
অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সুমনার পেটে রয়ে গেছে তিনটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। গ্ল্যামার দুনিয়ার চকমকি আলোয় যেখানে দাগ লুকিয়ে রাখাই দস্তুর, সেখানে সুমনা এই দাগগুলোকে দেখছেন এক অদ্ভুত গর্বে। তাঁর কথায়, “এই দাগ আর স্মৃতিগুলোই তো প্রমাণ করে যে আমি একটা যুদ্ধ জিতে বেঁচে আছি!”
তবে শুধু শরীরের ভেতর নয়, এই দু’মাসের একাকীত্ব সুমনার মানসিক জগতেও একটা বড়সড় সুনামি এনে দিয়েছে। এতদিন যে ইনস্টাগ্রামের লাইক, কমেন্ট আর ফলোয়ারের সংখ্যার পেছনে তিনি দৌড়চ্ছিলেন, তা যে কতটা অর্থহীন, তা টের পেয়েছেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই। জুন মাসে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে জন্মদিনে হুট করেই উড়ে গিয়েছিলেন ইস্তাম্বুল। উপলব্ধি করেছেন, ভালবাসার মাপকাঠি কখনও স্ক্রিনের কয়েকটা ‘লাইক’ হতে পারে না।
আর্টিকেলের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্য লুকিয়ে আছে সুমনার আগামী দিনের পরিকল্পনায়। অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি আড়ালেই রাখবেন, কিন্তু নিজের এই লড়াইকে হাতিয়ার করে তৈরি করবেন এক নতুন প্ল্যাটফর্ম। যেখানে আর কোনও ‘লাইক-কমেন্টের’ ইঁদুরদৌড় থাকবে না।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সুমনা তুলে ধরেছেন গ্ল্যামার জগতের এক অন্ধকার দিক। একজন নারী এবং অভিনেত্রী হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর পোস্টের নিচে কুরুচিকর, বিকৃত ও নোংরা মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছে একদল পুরুষ ট্রোলার। সুমনার সাফ কথা, “এসব ট্রোলিং থাকবেই, এটা আমার পেশার অংশ। আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অভিনয় করে যাব।”
কিন্তু এবার তিনি বদলাতে চান সোশ্যাল মিডিয়ার সংজ্ঞা। নিজের অ্যাকাউন্টকে তিনি রূপ দিতে চান এমন এক মুক্তমঞ্চে—যেখানে সমমনোভাবাপন্ন মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা এসে খোলাখুলি কথা বলবেন তাঁদের অন্তরের কথা নিয়ে। যেখানে আলোচনা হবে:
মহিলাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেরিমেনোপজের মতো তথাকথিত ‘ট্যাবু’ বিষয়।
সিঙ্গেল থাকার স্বাধীনতা কিংবা সন্তানহীন সুখী দম্পতিদের লাইফস্টাইল।
এর পাশাপাশি থাকবে গাছপালা, বই, পোষ্য আর ঘুরে বেড়ানোর এক নিখাদ ডায়েরি।
সুমনার এই সাহসী প্রত্যাবর্তনে বলিপাড়ায় এখন প্রশংসার ঝড়। অর্চনা পূরণ সিং থেকে শুরু করে করণ ভি গ্রোভার—সবাই কুর্নিশ জানিয়েছেন সুমনার এই নতুন লড়াইকে।
বয়স বাড়াকে সমাজ যেখানে ভয়ের চোখে দেখে, সেখানে দাঁড়িয়ে ৩৮ বছর বয়সী সুমনা চক্রবর্তী যেন এক নতুন ইশতেহার লিখলেন—“বয়স বাড়াটা ভয়ের নয়, এটা একটা প্রিভিলেজ। বয়স যদি সঙ্গে করে একটুখানি বুদ্ধি, কিছুটা দৃষ্টিভঙ্গি আর একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে আসে, তবে সেই বয়সের সঙ্গে পাওয়া পেটের প্রতিটা ক্ষতচিহ্নকেও আমি বুক পেতে নেব।”
পর্দার অভিনেত্রী হিসেবে হয়তো সাময়িকভাবে আড়ালে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের যে সুমনা ফিরে এলেন তাঁর ঝাঁঝ আর জেদের সামনে ট্রোলাররা এখন কোণঠাসা!















