সমুদ্রকে যেমন দু'হাতের মুঠোয় ধরার চেষ্টা করার বৃথা, আশা ভোঁশলের মতো প্রতিভাকে কয়েকটি শব্দে প্রকাশ করতে চাওয়াও তেমনই অসম্ভব৷ তবুও যে কণ্ঠ শুনে চিনলাম সুর, ভালবাসলাম গান, যাঁর কণ্ঠের মাদকতায় ভেসে গেল সদ্য কিশোরী, বেভুল সুরে গুনগুন করল প্রেম, বাবা মায়ের বকুনি উপেক্ষা করে প্রাক-কৈশোরেই যে মেয়ের কাছে গভীর রাতের সঙ্গী হল আশা ভোঁসলের গান, দ্রোহ, প্রেম, বিরহ-বিচ্ছেদে যে কণ্ঠের জাদু ছিল মনের আরাম, সেই কন্ঠের প্রতি সেই গায়কীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ কিছু শব্দ সাজানোর চেষ্টা৷ 

নাইন্টিজ এমন এক সময় যা আসলে সন্ধিক্ষণ, পুরনো আর নতুনের অদ্ভুত মিশেল। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা দিলেন রেডিও৷ মুখচোরা এক মেয়ের প্রাণের বন্ধু হল সে৷ ইস্কুল, পড়াশোনা সব শেষে প্রতি রাতে বন্ধুর সঙ্গে মোলাকাত৷ সেই বন্ধু নিয়ে যায় সুরসমুদ্রে, সেখানেই হিল্লোল তোলে এক জাদুকণ্ঠ, নাম আশা ভোঁসলে৷ 

 মেরা কুছ সামান, দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়, কতরা কতরা, পিয়া তু, ফিরে এলাম দূরে গিয়ে, ভেবেছি ভুলে যাব, ছন্দে ছন্দে গানে গানে লিখে শেষ করা যাবে না, একের পর এক গান যতবার শুনি তত বেশি মুগ্ধতা ঘিরে ধরে৷ এই মুগ্ধতা আজীবনের৷ এই মুগ্ধতা প্রজন্মের থেকে প্রজন্মকালে আবহমান৷ 

আশা ভোঁসলে, ভারতীয় সঙ্গীতজগতের অন্যতম নক্ষত্র, বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম৷  জন্মগ্রহণ করেন ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সালে সাংলিতে। তাঁর বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন খ্যাতনামী শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং থিয়েটার অভিনেতা।

সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠা আশার৷ পাঁচ ভাইবোন - লতা, আশা, ঊষা, মীনা এবং হৃদয়নাথ। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন আশা৷ চার বছরের বড় দিদি লতা মঙ্গেশকর কাঁধে তুলে নিলেন সংসারের দায়িত্ব৷ আশাও দিদির পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন৷ 

বাবার পরিচিত মাস্টার বিনায়ক, তিনিই ছোট্ট লতা আর আশাকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করালেন সিনে দুনিয়ার সঙ্গে। ১৯৪৩ সালে ১০ বছর বয়সে মারাঠি সিনেমা 'মাজা বাল' সিনেমায়  'চলাচল নওবালা গান' দিয়ে সঙ্গীতজগতে পদার্পণ করলেন আশা ভোঁসলে৷ 

 এরপর ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র 'চুনারিয়া'-তে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে 'রাত কি রানী' ছবিতে আশা ভোঁসলে প্রথমবার একক গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন৷ ততদিনে লতা মঙ্গেশকর সঙ্গীতজগতে পরিচিত৷ ১৬ বছরের আশা আর ২০ বছরের লতা দুই বোন মিলে মঙ্গেশকর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ফিরিয়ে আনলেন৷ 

 কিন্তু আচমকা ছন্দপতন৷ দিদি লতা মঙ্গেশকরের ম্যানেজার ছিলেন গণপত রাও ভোঁসলে। ১৬ বছরের আশা মন দিলেন ৩১ বছরের গণপতরাওকে৷ দিদি জানতে পেরে বোনকে সাবধান করলেও কিশোরী মেয়ের উদ্দাম প্রেম বাধা মানেনি৷ বাড়ির অমতে পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করলেন আশা। এরপর শুরু হল আরেক সংগ্রাম। সংসারে টিকে থাকার লড়াই৷ 

প্রেমের মাশুল দিতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে আশার৷ 
উদয়স্ত খেটে চলেছেন আশা৷ সংসারের কাজ, বাচ্চার দেখভাল সব করেও গনপত রাওয়ের চাপে পড়ে দিনে চার পাঁচটা গান গাইছেন আশা৷ 
১৯৪০-১৯৫০ এই সময়ের মধ্যেই আশা ভোসলে প্রায় ৮০০ গান রেকর্ড করেন৷ কিন্তু এই সব গান শিল্পী হিসাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেয়নি কারণ ততদিনে লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্ত সুরের জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র৷ সমস্ত সঙ্গীত পরিচালক লতা গীতারাই প্রথম পছন্দ৷ 

এঁরা গাইতে রাজি না হলে তখন আশার কাছে গান গাওয়ার সুযোগ আসছে৷ অথবা বি গ্রেড সি গ্রেড ছবিতে আসছে গানের সুযোগ। 'না' শব্দটা ছিল না আশা ভোঁসলের অভিধানে৷ তিনি থামতে জানেন না, কঠিন পথ অতিক্রম৷ করে কেবল সামনে এগোতে জানেন৷ 

আশার এই লড়াইতে সঙ্গ দিলেন ওপি নাইয়ার৷ সিআইডি ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ দিলেন৷ এই ছবির গান জনপ্রিয় হল৷ এরপর 'নয়া দওর' ছবিতে প্রথমবার নায়িকার কণ্ঠে সমস্ত গান গাইলেন আশা ভোঁসলে৷ এই ছবিই ভাগ্য বদলে দিল আশার৷ ভারতীয় সঙ্গীত পেল এক নতুন জুটি ওপি নাইয়ার-আশা ভোঁসলে। আইয়ে মেহেরবান, দিওয়ানা হুয়া বাদল, কাজরা মহব্বতওয়ালা একের পির এক হিট গান উপহার দিলেন ওপি-আশা জুটি৷ 

সুরের দুনিয়ায় যখন নিজের ভিত কিছুটা শক্ত করেছেন আশা, সেই সময় আচমকা মাথার ছাদ গেল চলে৷ ১৯৫৯ সালে গণপত রাও একদিন মধ্যরাতে মারধর অত্যাচার করে অন্তঃসত্ত্বা আশাকে দুই সন্তান সহ বাড়ি থেকে বার করে দিলেন৷ অসহায় আশা ফিরে গেলেন মঙ্গেশকর পরিবারে৷ ১৯৬০ সালে বিচ্ছেদ হল গণপত রাওয়ের সঙ্গে।  বিচ্ছেদের পরে পুনরায় প্রেম এল আশার জীবনে৷ ওপি নাইয়ারের সঙ্গে আশা ভোসলের সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর৷ 

ওপি নাইয়ার তখন বিবাহিত এবং চার সন্তানের পিতা৷ আশা ভোঁসলে সেই সময় ওপি নাইয়ারের সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন। দিদি লতা কিছুতেই এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি৷ ফের দূরত্ব বাড়ল দুই বোনের৷ ১৪ বছর সম্পর্কে ছিলেন আশা আর ওপি নাইয়ার৷ কিন্তু ওপি নাইয়ারের বিচ্ছেদ না হওয়ায় তাঁরা কখনও বিয়ে করেননি৷ ওপি নাইয়ারের সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের রক্তচক্ষুকে ভয় পেলেন ওপি নাইয়ার৷ দূরত্ব বাড়ল আশার সঙ্গে। ভালবেসে আবারও ভুল করলেন আশা৷ 

ঠিক এই সময় বলিউডে রয়্যালটি বিবাদ শুরু হল৷ একদল লতা মঙ্গেশকর, অন্যদল মহম্মদ রফি। এই দলাদলিতে আশা ভোঁসলে মহম্মদ রফির দলে ভিড়লেন৷ দুই বোনের মধ্যে সম্পর্কে আরও ফাটল ধরল৷ 

শচীন দেব বর্মনের সঙ্গেও সেই সময় লতা মঙ্গেশকরের বিবাদ হওয়ায় লতার গাওয়ার কথা যে সব গান সেই সমস্ত গান শচীন দেব বর্মন গাওয়ালেন আশাকে দিয়ে৷ ছোড় দো আঁচল, হাল ক্যায়সা হ্যায়, রাত আকেলি হ্যায়, আচ্ছা জি ম্যায় হারই চলো একের পর এক হিট গানে আশা ভোঁসলে মন জিতে নিলেন শ্রোতাদের৷ 

১৯৬৫ সালে শচীন দেব বর্মন একটি গান গাইতে বললেন আশাকে৷ তার জন্য রাহুল দেব বর্মনকে পাঠালেন আশা ভোঁসলের কাছে৷ যদিও এর আগেই রাহুল দেব বর্মন দেখেছেন আশাকে৷ যদিও সেই সময় আশা তেমন পছন্দ করতেন না রাহুল দেব বর্মনকে৷ 

১৯৬৬ সালে রাহুল দেব বর্মন 'তিসরি মঞ্জিল' ছবির জন্য গান গাওয়ালেন আশা ভোসলেকে৷ এই ছবির সমস্ত গান সুপারহিট৷ ও মেরে সোনা রে সোনা, আজা আজা ম্যায় হু প্যায়ার তেরা, ও হাসিনা জুলফো বালে জানে যাঁহা, তুমনে মুঝে দেখা হোকর ম্যাহেরবাঁ এই সব গান এখনও মুখে মুখে ফেরে৷ এই ছবিতে গান গাওয়ার পর থেকেই আশা ভোঁসলে রাহুল দেব বর্মনের বহুমুখী সঙ্গীত প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেন। 

হিন্দি সঙ্গীতের ইতিহাসে সৃষ্টি হল নতুন জুটি৷ আশা ভোসলে রাহুল দেব বর্মন একের পর এক নতুন সুপারহিট গান উপহার দিতে থাকলেন৷ ভারতীয় সঙ্গীতের ধারায় এল পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অনুরণন, সুরের ছোঁয়ায় রঙ লাগল দু'জনের মনে। 
ওপি নাইয়ারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও বিচ্ছেদের কথা ভাবেননি আশা কিন্তু একদিন আবেগের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে ওপি নাইয়ার আশার মেয়ে বর্ষাকে মারতে উদ্যত হলে আশা ওপি নাইয়ারের সম্পর্কের শেষ হল৷ 


একদিকে শেষ হল সম্পর্ক, অন্যদিকে শুরু হল গভীর বন্ধুত্ব৷ সেই বন্ধুত্ব কখন যেন বদলে গেল প্রেমে৷ দুজনের প্রেম ছিল সঙ্গীতের সঙ্গে।  কিন্তু সুরে সুরে কখন যেন রাহুল দেব বর্মন মন দিয়ে ফেললেন আশাকে৷ প্রতিদিন গোলাপ পাঠাতেন আশার জন্য। এমনই এক দিন যখন রাহুল দেব বর্মন এর তরফ থেকে গোলাপ এসে পৌঁছল আশার বাড়িতে তখন রাহুল দেব বর্মন মজনু সুলতান পুরীর সঙ্গে আশার ঘরেই বসে৷ গোলাপ দেখেই রেগে গেলেন আশা।  কে রোজ রোজ পাঠায় এখনই ফেলে দাও বলতেই রাহুলের মুখের চেহারা গেল বদলে আর মজনু সুলতান পুরী বললেন এই সেই বোকার হদ্দ৷ 

এরপর রাহুল দেব বর্মন বিয়ের প্রস্তাব দিলেন আশাকে৷ কিন্তু বিয়ে নামক বিভীষিকা থেকে দূরে থাকতেই চান আশা৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা ভোসলে বুঝলেন রাহুল দেব বর্মনের ভালবাসা কতটা গভীর৷ দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষা করেছিলেন রাহুল দেব বর্মন৷ বিয়ে করলে আশাকেই করবেন, রাহুল দেব বর্মনের এই জেদের প্রতিই আস্থা রাখলেন আশা৷ 

১৯৮০ সালে রাহুল দেব বর্মন আর আশা ভোসলে বিয়ে করেন৷ তখনকার দিনে বিবাহবিচ্ছিন্না, তিন বাচ্চার মা,  তার থেকে ৬ বছরের ছোট ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন আশা ভোসলে৷ এই বিয়েই খুশি এনে দিল আশার জীবনে৷ তাদের সম্পর্কের ভিত ছিল সঙ্গীত। কিন্তু ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিক থেকে গানের ধারা কিছুটা বদলে গেল৷ বদলের সঙ্গে ততটা খাপ খাওয়াতে পারলেন না রাহুল দেব বর্মন। গান কমতে লাগল অবসাদে ডুবে যাওয়া রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গী হল মদ৷ আশা রাহুলের সম্পর্কের অবনতি হল। ১৯৯৩ সালে রাহুল দেব বর্মন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন৷ একদিকে সম্মান পুরস্কার আলো অন্যদিকে অন্ধকার।  সঙ্গী ছেড়ে গেলেন, পঞ্চম সুর মুছে গেল আশার জীবন থেকে৷ আশা ভোঁসলের জীবনে আবারও অন্ধকার নেমে এল। 

 প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর আঘাত এত তীব্র ছিল যে গান থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন আশা৷ তবে নতুন ভাবে ফিরে এলেন এ আর রহমানের গানের মাধ্যমে৷ রঙ্গিলা, তনহা তনহা গাইলেন ৭০ বছর বয়সে৷

২০০০ সালে ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয় আশা ভোসলে কে৷ ২০০৮ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান আশা৷ পদ্মবিভূষণ, সেরা গায়িকার একাধিক পুরস্কার আশার ঝুলিতে৷ এমনকি একসময় তিনি পুরস্কার নেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন যাতে অন্যরা পুরস্কার পান। 

যখন সকলে ভাবলেন এবার আশা ভোঁসলে অবসর নেবেন তখন তিনি নতুন ভাবে ফিরলেন কাম্বাক্ত ইস্ক এর মতো গান গেয়ে৷ কিন্তু লড়াই যতই করুন, দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি আশার৷ ২০১২ সালে আত্মহত্যা করলেন আশা ভোঁসলের মেয়ে বর্ষা৷ ২০১৫ সালে ক্যানসারে মারা গেলেন আশা ভোঁসলের বড় ছেলে হেমন্ত ভোঁসলে৷ 

 
বিবাহবিচ্ছেদের পরেও নামের সঙ্গে ভোঁসলে ব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছিল লতা মঙ্গেশকরের ছত্রছায়া থেকে বেরোতেই এই কৌশল নিয়েছিলেন আশা৷ যদিও আশা ভোঁসলে নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ছোটবেলায় লতা আর আশার কণ্ঠ একরকম ছিল।  নিজের পরিচয় তৈরি করতে ভেঙেছিলেন নিজেকে৷ ইংরাজি গান ইংরাজি সিনেমা দেখার অভ্যাস শুরু করেন৷ ভারতীয় গানে সুর সোজা লাগানো হয়৷ পাশ্চাত্য প্রভাব নিয়ে গাইতে শুরু করলেন ভারতীয় গান৷ 


 ইনা মিনা ডিকা গাওয়ার পর তাঁর গান নিয়ে কটাক্ষ শুরু হয়৷ পাশ্চাত্যের গানে এই ধরনের সুর ভাল লাগলেও ভারতীয় গান এমন হতে পারে না৷ এই দাবি উঠলেও তিনি ভেঙে পড়েননি, দমে যাননি৷ না শব্দ তার ডিকশিনারিতে নেই। তাই গায়কী বদলালে কটাক্ষ যতই আসুক, নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন আশা৷

১৯৭১ এর গান পিয়া তু আব তো আজা, 
সেই সময়ের প্রেক্ষিতে শুধু নয়, আজকের দিনেও ভারতীয় সঙ্গীতে আধুনিকতা এবং প্রাসঙ্গিকতার সমার্থক এই গান। পাঁচ দশক পেরিয়েও প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গানে নেচে ওঠে৷ সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এই গান অশ্লীল বলে দাগিয়ে দেওয়ায় রেডিওয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল গান। সময়ের সঙ্গে তিনি বদলেছেন। তাঁর মতে গানের কথা গানের আত্মা আর শরীর হল সঙ্গীত পরিচালক। 
গানকে সাজানোর দায়িত্ব গায়ক গায়িকার৷ এখনের মতো প্রযুক্তি উন্নত ছিল না। একবার গাওয়াতেই রেকর্ড করা হত৷ সামান্যতম ভুল হলেও সেই গান আবার শুরু থেকে পুরোটা রেকর্ড করতে হত৷


ভোর ৪ টে ৫ টা বাজলেও গান শেষ না করে খেতেন না আশা৷ শচীন দেব বর্মন, মদনমোহন, ওপি নাইয়ার সকলের গানের ধরন আলাদা৷ প্রতিটা গান গাওয়ার আগে শান্ত হয়ে বসতেন আশা৷ কিছুক্ষণ আত্মস্থ করতেন গানের কথা সুর ভাব তারপর গাইতেন।


গুরুজিকে গিয়ে সঙ্গীত সাধনার কথা বলেননি আশা। বলেছিলেন বাস্তবতার কথা৷ সন্তানের মুখে দু'বেলা অন্ন তুলে দিতেই তার গান গাওয়া তাই এমন গান শিখতে চান যা তাকে অন্নসংস্থান করবে। মাস্টার সাজ্জাদ হোসেন যাঁর কাছে গান গাওয়ার জন্য সেই সময় শিল্পীরা মুখিয়ে থাকতেন তাকে আশা ভোসলে বললেন আমি গান জানি না। আমাকে যা শেখাবেন তাই শিখব, আমি গান গাই আমার পরিবার চালানোর জন্য.

 সুরের হিল্লোলে ভেসে থাকা দুই মানুষের জীবনেও ছিল প্রেমের খুনসুটি।  আশা ভোসলে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতে এতই ভালবাসতেন যে রাহুল দেব বর্মন যেতেন রেগে৷ জন্মদিনে ফুলের তোড়ার  সঙ্গে ঝাটা এমনকি গয়নাতেও ঝাঁটা দিয়েছিলেন
 
নিজের দুঃখ কখনও প্রকাশ করতেন না আশা৷ তাঁর জীবন ছিল গানের জন্য উৎসর্গীকৃত৷ যাই হোক, দ্য শো মাস্ট গো অন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গজল হোক বা প্রেমের গান কিংবা পার্টি সং - সব কিছুতেই নিজের প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন আশা৷ 

শুধু গান নয়, রান্নাতেও সমান পারদর্শী আশা ভোঁসলে৷ খাবার বানাতে ভালবাসেন বলেই কাতার,কুয়েত,দুবাই ইজিপ্ট সহ ৬ জায়গায় রেস্তোরাঁ খুলেছেন আশা৷ এইসব রেস্তোরাঁয় যাঁরা কাজ করেন তাঁদের প্রথম ছয় মাস আশা ভোঁসলে ট্রেনিং দেন৷ 

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়েছেন আশা। ২০ টির বেশি ভাষায় ১৪ হাজার গান গেয়েছেন। ৯০ বছর বয়সেও কনসার্ট করেছেন আশা৷ হিন্দি, মারাঠি, বাংলা, গুজরাটি, পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে ইংরেজি ও রুশ ভাষাতেও গান করেছেন।

প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান ১৯৮১ সালে। উমরাওজান ছবিতে দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় গানটি ৬০ বছর পরেও সমান জনপ্রিয়, ভারতীয় সঙ্গীতের ব্যকরণ বলা যেতে পারে এই গান৷ 

স্বামী নয়, বন্ধু হিসাবেই পরিচয় দিয়েছেন আশা রাহুল দেব বর্মনকে। জ্যাজ, ল্যাটিন আমেরিকান, সাউথ আমেরিকান, আফ্রিকান গানের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন রাহুল। ইংরাজি না বুঝেও বব ডিলানের সঙ্গে গান গেয়েছেন আশা৷ সঙ্গীতের দুনিয়ায় এক বিস্ময় আশা ভোঁসলে৷ যতদিন সুর থাকবে ততদিন আশাও থাকবেন লক্ষ কোটি শ্রোতার মনে। হাজার না পাওয়া, লড়াই, প্রতিবন্ধকতা সব কিছুর শেষে সেই এক অভীষ্টকে পাওয়ার আশা, সুরের সাধনায় নিজেকে লীন করে দেওয়া আশা, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুর ছুঁয়ে থাকা আশা...