বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই গায়ক তথা প্রাক্তন বিধায়ক ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হল সঙ্গীতশিল্পী পিয়ালী বসু রায়চৌধুরীর। তিনি জানালেন বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি কোন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। কী কী সহ্য করেছেন।
এদিন পিয়ালী বসু রায়চৌধুরী আজকাল ডট ইনকে বলেন, "অ্যাপস সংগঠনের সঙ্গে ১৯৯৯ সাল থেকে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলা হতো সরকারি অনুষ্ঠান আর অ্যাপস এক নয়। যে অনুষ্ঠানগুলো হয় তাতে অ্যাপসের কোনও ভূমিকা নেই। কিন্তু প্রথম থেকে আমি দেখে এসেছি, যত শিল্পী সেই অনুষ্ঠানগুলোতে গান করেন, তাঁদের ৮৫ শতাংশ অ্যাপসের শিল্পী। আর এখন তো প্রায় ১০০ শতাংশই অ্যাপসের শিল্পী। নামী শিল্পীদের ডেকে এনে এনে, লাইফটাইম মেম্বারশিপ দিয়ে, তাঁদের হাত কচলে 'এসো এসো' করা হয়েছে যাতে অ্যাপসের নাম আরও বাড়ে। সারাজীবনই ইন্দ্রনীল সেন এবং শিবাজী চট্টোপাধ্যায় সংগঠনটাকে চালিয়েছেন। আমার সঙ্গে দিনের পর দিন ভীষণ খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে।"
তাঁর আরও সংযোজন, "২০১৬ সালে ইন্দ্রনীল সেন যখন মন্ত্রী হলেন, সেই অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়ল। তার আগে থেকেই শিবাজীদাকে বলতে শুরু করি, সবাইকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনুষ্ঠান দাও। কারণ তখন ১৫ জনের গ্রুপ ছিল, আর অ্যাপসের শিল্পীদের দিয়েই সরকারি সমস্ত অনুষ্ঠানে গাওয়ানো হতো। যতবারই এটা বলেছি, ততবারই বলা হয়েছে 'না, তোকে দেওয়া যাবে না।' আমাকে বলা হতো, আমি নাকি পিওর রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী, তাই আমাকে সুযোগ দেওয়া যাবে না। অথচ যাঁদের শিবাজীদা সামনে এনেছেন, তাঁরা নাকি সব বিশাল বিশাল শিল্পী। তাঁরা সকলে লাইন দিয়ে রবীন্দ্র সদনে ঢুকে পড়লেন, তাঁরাই ২২ শ্রাবণে গাইছেন, কবি প্রণামে গাইছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল গাইছেন। তাল কাটছে, স্থায়ী থেকে অন্তরায় যেতে গান ধরতে পারছেন না। রবীন্দ্রনাথকে ভেঙেচুরে চুরমার করে দেওয়া যাকে বলে তাই চলল। ওটা নাকি বিরাট ব্যাপার। আমরা নাকি ঘ্যানঘ্যানে রবীন্দ্রনাথের গান গাই, তাই কেউ শোনে না আমাদের গান, এটা শিবাজীদার বক্তব্য। তারপর শুরু হল আমায় থ্রেট করা। কিছু বললেই বলা হতো, 'তুই এটা বলবি না, তুই কেন বলবি', অথচ এই সংগঠনের জন্য এমন কাজ নেই যা আমি করিনি। যা বলেছে সব করেছি। সঙ্গীতমেলায় একসময় সৈনিকের মতো কাজ যাকে বলে সেটা করেছি।"
পিয়ালী বসু রায়চৌধুরীর কথায়, "এখানে কোনও দিন ইলেকশন হয় না, সিলেকশন হয়। একবারই ইলেকশন হয়েছিল, সেই কমিটি কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। অন্য দু'জন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরা নামী শিল্পী নন বলেই হয়তো সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। আমার পরবর্তীকালে মনে হয়েছিল ইন্দ্রনীল সেন এবং শিবাজী চট্টোপাধ্যায় ছাড়া এই সংগঠন বোধহয় আর কেউ চালানোর ক্ষমতা রাখে না।"
এদিন কথা বলতে বলতে একটি বিশেষ ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন পিয়ালী। তিনি বলেন, "২০১৯ সালে আমি ছাড়া আর দু'জন শিল্পী প্রতিবাদ করেছিলাম। সেই সময় শিশির মঞ্চ রেনোভেট হওয়ার পর শিবাজীদা বলেছিলেন তোরা এবার ভাড়া নিয়ে গা। অথচ সরকারি অনুষ্ঠানে শিবাজীদা আর ইন্দ্রনীল সেনের তাঁবেদাররা গাইবেন। সেটা নিয়ে ঝামেলা হল। আমি যেহেতু ১৯৯৯ সাল থেকে যুক্ত, আমি অনেক ঘটনার সাক্ষী। আমি বললাম, শিবাজীদা তুমি এটা ঠিক করছ না, অন্যেরা সরকারি অনুষ্ঠানে গাইবেন আর আমাদের শিশির মঞ্চ ভাড়া নিয়ে গাইতে হবে? উনি তাতে আমায় বলেছিলেন, 'একটা কথাও শুনব না। আমার টিম নিয়ে আমি যা খুশি করব।' পরবর্তীকালে শুনেছি, এই টিম ইন্দ্রনীল সেন তৈরি করতে বলেছিলেন, বলেছিলেন একটা ক্লাব হোক এটা। সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য শিল্পী এই ক্লাব থেকে সাপ্লাই হবে। ২০১৯ সালে শিবাজীদা চলে গেল, পরে বুঝলাম সবই নাটক হয়েছিল। ২০২১ সালে আমাদের ভোট হল। সৈকত মিত্র অনেক জোর করে ইলেকশন করিয়েছিলেন। সেই সময় দেখলাম যাঁরা অ্যাপসে আসেন না তাঁরাও ভোটে দাঁড়িয়েছেন। নমিনেশন জমা দেওয়ার শেষ দিনে আমি নমিনেশন জমা দিই। পরে একটা ১৫ জনের লিস্ট বেরোল, শুনলাম সেটা ইন্দ্রনীল সেন এবং শিবাজী চট্টোপাধ্যায় মিলে ঠিক করেছেন, প্রচার করেছেন যে এঁদের এঁদের জেতান। একটাই টার্গেট ছিল যাতে আমাকে হারানো যায়, যেহেতু আমি মুখ খুলেছি। ওদের একটাই স্ট্র্যাটেজি ছিল, যে মুখ খুলবে তাকে কোণঠাসা করে দাও, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাও। কিন্তু সেই ভোটে আমিও জিতি, কমিটিতে আসি। এই কমিটির সেক্রেটারি হয়েছিলেন সৈকত মিত্র। উনি অনেক চেষ্টা করেছিলেন যাঁরা সদস্য আছেন তাঁদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনুষ্ঠান দেওয়ার। তার মধ্যে রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠান হলে ওঁরাই গাইতেন, ওটা তো ওঁদের কেনা। রবীন্দ্র সদনে আমি অডিশন দিয়ে পাশ করার পরও আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, বের করে দিয়েছে। নবীনবরণের অনুষ্ঠান হবে ঠিক হল। সেই অনুষ্ঠানের আগের দিন সৈকত মিত্র মিটিং ডাকলেন, কিন্তু কেউ এলেন না। আমার মনে হয়েছিল সেক্রেটারি ডেকেছেন যাওয়া উচিত। এছাড়া পরিমল ভট্টাচার্য এলেন, ওঁর কাজই ছিল খবর আদান প্রদান করা। সেটা পরে বুঝেছি যদিও। আর সৈকত মিত্র ছিলেন। অন্য কেউ আসেননি। সেই অনুষ্ঠানে শ্রীরাধাদি, ঊষাদি, হৈমন্তী শুক্লা সকলে এলেন। বড় করে অনুষ্ঠান হল। তারপরই, হঠাৎ দেখলাম শ্রীরাধাদি সিন থেকে কোথায় চলে গেলেন। মিটিংয়ে আসা বন্ধ করে দিলেন। তারপর দেখলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত গান উনি গাইছেন। কিন্তু আমার কথা হল, আমাদের কমিটি যতদিন থাকবে, উনি ততদিন তাতে থাকবেন। কিন্তু উনি হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলেন। এটা তো উনি নিশ্চয় নিজের আনন্দেই করেছেন। কেউ নিশ্চয় ভয় দেখায়নি। বাকি আরও অনেকেই গেয়েছেন।"
কেবল গান গাওয়ানো নয়, বা সরকারি অনুষ্ঠান নিয়ে সমস্যা নয়, সমস্যা হয় সিসিটিভি লাগানো নিয়েও! পিয়ালী এই বিষয়ে বলেন, "সৈকত মিত্র সেক্রেটারি হওয়ার পর সিসিটিভি লাগানো হয়েছিল। সেটা নিয়েও সমস্যা ছিল শিবাজী চট্টোপাধ্যায় এবং ইন্দ্রনীল সেনের। এটা নিয়ে সৈকত মিত্রকে হুমকি দেওয়া হতো, অপমান করা হতো। অ্যাপস ভবনের যে দলিল সেটা ইন্দ্রনীল সেনের বাড়িতে থাকত। সেটা বের করা আনা হয়েছিল বলে কী রাগ! সংগঠনের ভালটা যেমন আনন্দের, খারাপটাও তেমন দুঃখের। আমার সঙ্গে যে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে দিনের পর দিন, সেটা করেছেন শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, তিনিই ইন্দ্রনীল সেনের কান ভাঙিয়েছেন।"
পিয়ালী বিস্ফোরক দাবি করে জানান তিনি এখনও শেষ সঙ্গীতমেলার টাকা পাননি। তাঁর কথায়, "সবথেকে বেশি পারিশ্রমিক পেতাম আমি গত ১০ বছর ধরে। তপন তরফদার আমার সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছেন, বলেছেন, 'উপর মহল থেকে বলা হয়েছে আপনাকে ২ হাজার টাকাই নিতে হবে'। আমি বললাম, ২০১৬ থেকে যে আমায় ৭ হাজার করে টাকা দেওয়া হতো? আমার কাছে তো ব্যাঙ্কের তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তখন বললেন, 'ভুল করে ১০ বছর ধরে এই টাকা দেওয়া হয়েছে।' আমার প্রশ্ন, কোনও সরকার ১০ বছর বেশি টাকা দিয়ে এখন হঠাৎ মনে করেছে কম টাকা পাওয়ার যোগ্য আমি? এটা একটা শিল্পীর অপমান নয়? শিবাজীদাকে বলতে গেলে পাত্তা দেননি। ওঁরা জানতেন আবার জিতে আসবেন এবং গুন্ডারাজ করবেন। গুন্ডারাজ চালিয়েছেন রীতিমত। গত ১০ বছর রবীন্দ্র সদনে ঢুকতে দেননি। যে যা অন্যায় করেছে সেটা তো সামনে আসবেই। এই ইন্দ্রনীল সেন, শিবাজী চট্টোপাধ্যায় আমার জীবন থেকে ১৫ বছর কেড়ে নিয়েছে। আমাকে তো এক্সপ্লয়েট করেছেই, আরও বহু শিল্পীকে করেছে। আমি এঁদের পায়ে পড়তে যাইনি, ভদ্রভাবে অনুরোধ করেছি, এঁরা শোনেননি। দিনের পর দিন বলেছেন, 'শুনব না, যা পারিস করে নে। দেখ কেমন লাগে।' এই ভাষায় কথা বলেছেন।"















