মুক্তির এক দশক পেরিয়েও হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা স্পোর্টস ড্রামা হিসেবে নিজের জমি ধরে রেখেছে ‘সুলতান’। আর এর নেপথ্যে রয়েছে সলমন খানের সেই অবিশ্বাস্য ভোলবদল। নিজের চেনা ‘লার্জার-দ্যান-লাইফ’ ইমেজ ঝেড়ে ফেলে এই তারকা পর্দায় তুলে ধরেছিলেন এক বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কুস্তিগিরকে, যে শুধু রিংয়ের প্রতিপক্ষের সঙ্গেই লড়ছিল না, লড়াইটা ছিল তার নিজের ভেতরের অহংকারের সঙ্গেও। ছবির এই দুর্দান্ত সফর নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুললেন পরিচালক আলি আব্বাস জাফর। জানালেন, কীভাবে তৈরি হয়েছিল ‘সুলতান’ এবং কেন সলমন ছাড়া আর কাউকেই এই চরিত্রের জন্য ভাবেননি তিনি। পাশাপাশি তিনি জানান, এই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের জন্য সিলভেস্টার স্ট্যালোন-এর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন তিনি!
সাক্ষাৎকারে আলি বলেন “গল্পের আইডিয়াটা ছিল মাত্র এক লাইনের—এক ব্যক্তি যে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় এবং লড়াই করে নিজেরই অহংকারের বিরুদ্ধে। আমি বরাবরই স্পোর্টস ড্রামার বড় ভক্ত। এমন একটা ছবি বানাতে চেয়েছিলাম যার শিকড় থাকবে এদেশের মাটিতে, যাকে আপনারা চলতি কথায় বলেন একদম ‘দেশি’ ছবি। তাই আমরা কুস্তিকে বেছে নিয়েছিলাম। ভারতে এই খেলার ইতিহাস দীর্ঘ। এই খেলাটার মানেই হলো মাটি, কাদা, আছাড় খাওয়া, আবার উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করার চেষ্টা—যা আসলে আমাদের জীবনেরই আরেক নাম।”
প্রধান চরিত্রের কাস্টিং নিয়ে পরিচালকের মনে কোনো সংশয় ছিল না। আলির কথায়, “এই ছবির জন্য সলমন খানই ছিলেন একমাত্র বিকল্প। আমি যখন আদিত্য চোপড়াকে গল্পটা শুনিয়েছিলাম, ও এক বাক্যে বলেছিল—এই চরিত্রটা সলমন ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না। আমি সম্পূর্ণ একমত ছিলাম। আমরা ঠিকই করে নিয়েছিলাম, সলমন রাজি হলেই ছবিটা হবে, নয়তো নয়। আর যখন সলমনকে স্ক্রিপ্টটা শোনালাম, ও ঠিক ১৫ মিনিট সময় নিয়েছিল ‘হ্যাঁ’ বলতে।”
সুলতানের চরিত্রের জন্য সলমন যেভাবে নিজেকে নিংড়ে দিয়েছিলেন, তারও প্রশংসা করেন পরিচালক। “শারীরিক পরিবর্তন থেকে শুরু করে হরিয়ানভি উপভাষা শেখা, কুস্তির জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি, ওজন বাড়ানো এবং কমানো—সবকিছুতেই সলমন নিজের সেরাটা দিয়েছিলেন। ও প্রথম দিনই বলেছিল, ‘এই চরিত্রের জন্য একটা মারাত্মক ট্রান্সফরমেশন দরকার, আমি সেটা করব।’ তাই আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম।”
ছবিতে সলমনের বিপরীতে অনুষ্কা শর্মার কাস্টিং নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন পরিচালক। অনুষ্কা এর আগে জানিয়েছিলেন যে শুরুতে সলমনকে দেখে তিনি বেশ ভয়ই পেয়েছিলেন। তবে আলি মনে করেন, এই জড়তাটাই পর্দায় তাঁদের রসায়নকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছিল।আলি বলেন, “অনুষ্কা এই চরিত্রে যা এনেছিল তা এককথায় অনবদ্য। ওরা দুজনে বাস্তব জীবনে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, আর এই ‘অপোজিট অ্যাট্রাক্টস’ সমীকরণটাই ছবির পক্ষে কাজ করেছে। আসলে যারা ভাইকে কাছ থেকে চেনে না, তারা ওকে একটু ভয় পায়। কিন্তু একবার ওকে চিনে ফেললে বোঝা যায়, ওই কঠিন খোলসের নিচে কতটা চমৎকার একজন মানুষ লুকিয়ে আছেন। শুটিংয়ের শেষের দিকে আমাদের কাজ এতটাই মসৃণ হয়ে গিয়েছিল কারণ ততদিনে সবাই সবাইকে খুব ভাল করে চিনে গিয়েছিল।”
এই সাক্ষাৎকারে আলি এক বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেন। ছবিতে রণদীপ হুডা অভিনীত কোচের চরিত্রটির জন্য নির্মাতারা প্রথমে ভেবেছিলেন হলিউড তারকা সিলভেস্টার স্ট্যালনের কথা!
“রণদীপের চরিত্রের জন্য আমরা অনেক নাম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল সিলভেস্টার স্ট্যালনকে নিয়ে। আমরা ভেবেছিলাম, ‘রকি’র চেয়ে ভাল আর কে-ই বা সুলতানকে ট্রেইনিং দিতে পারে! আমি ওঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলাম। শুনেওছিলেন ছবির গল্প। স্ক্রিপ্টটা দারুণ লেগেছিল স্ট্যালনের, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওঁর ডেটস পাওয়া যায়নি।”
পরবর্তীতে রণদীপ হুডাকে নেওয়ার কারণ হিসেবে আলি জানান, “আমি এমন একজনকে চেয়েছিলাম যে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেতা। রণদীপ এর আগে সলমনের সঙ্গে ‘কিক’ ছবিতে কাজ করেছিল, তাই ওদের কেমিস্ট্রিও তৈরি ছিল। ‘ফতেহ’-র চরিত্রে ও যা কাজ করেছে, তা এক কথায় অসাধারণ।”
বর্তমানে পরিচালক আলি আব্বাস জাফর একটি রোমান্টিক-অ্যাকশন ছবি পরিচালনা করছেন, যেখানে প্রধান ভূমিকায় রয়েছেন অহান পান্ডে, শর্বরী এবং ঐশ্বর্য ঠাকরে। অন্যদিকে, সলমন খান ব্যস্ত পরিচালক ভামসি পেডিপাল্লির আগামী প্যান-ইন্ডিয়া অ্যাকশন ছবির শুটিংয়ে। তবে 'সুলতান' যে সলমনের কেরিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক হয়ে থাকবে, তা নিয়ে এক দশক পরেও কোনও সন্দেহ নেই।
















