অকালপ্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এবার বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা রিজওয়ান রব্বানি শেখ । শ্যুটিং সেটে নূন্যতম নিরাপত্তার অভাব এবং প্রোডাকশনের গাফিলতি নিয়ে তাঁর এই চাঁচাছোলা বয়ান টলিপাড়ার অন্দরের এক অন্ধকার দিক সামনে এনে দিয়েছে।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। তালসারিতে ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি, সেই নিয়ে উঠেছে তদন্তের দাবি।তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তালসারি মেরিন পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, শুটিংয়ের জন্য নেওয়া হয়নি কোনও পুলিশি অনুমতি, এমনকী থানাকেও জানানো হয়নি! সোমবার ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে রাহুলের। বেশি পরিমাণে বালি ঢুকে যাওয়ার অভিনেতার ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় জলের তলায় ছিলেন রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। রাহুলের মৃত্যু নিয়ে প্রযোজনা সংস্থার তরফে শুরু থেকেই গাফিলতি এবং বক্তব্যে অসঙ্গতি ছিল বলে অভিযোগ। সমুদ্রে নৌকার উপর থেকে ড্রোন শটের সমস্ত দায়ভার রাহুলের উপর দেওয়া হয়েছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে নূন্যতম সুরক্ষার অভাব ছিল বলেও উঠেছে বড়সড় অভিযোগ৷ এহেন আবহে এই প্রসঙ্গে মুখ খুললেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় তারকা রিজওয়ান রব্বানি শেখকে। টলিপাড়ার অন্দরে অবশ্য তিনি পরিচিত বেশি ‘সানি’ নামেই। জানালেন, তাঁরও প্রোডাকশনের গাফিলতিতে বড়সড় বিপদ হতে পারত,মৃত্যুও ঘটতে পারত! অভিনেতার কথায়, ‘শুটিং চলাকালীন সেদিন আমারও মৃত্যু ঘটতে পারত’। শুটিং ফ্লোরে ইউনিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
‘আঁচল’, ‘চোখের’ বালি থেকে ‘বধূঁয়া’ -একের পর এক জনপ্রিয় সব ধারাবাহিকে মুখ্যভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। বড়পর্দাতেও একাধিকবার হাজির হয়েছেন তিনি। আজকাল ডট ইন-কে সানি জানান, রাহুলের জায়গায় আজ তিনিও হতে পারতেন! তাঁর বক্তব্যে উঠে এল ধারাবাহিকের শুটিংয়ের প্রোডাকশনের গাফিলতির কথা। ক্ষুব্ধ স্বরে সানি বলে উঠলেন, “কম বছর তো হল না কাজ করছি ছোটপর্দায়, বহু বছর ধরেই প্রোডাকশনের গাফিলতি নিজের চোখে দেখে আসছি। নানান ধারাবাহিকের শুটিংয়ে নিজেও তো একাধিকবার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচেছি অল্পের জন্য! কখনও চলন্ত গাড়ি থেকে প্রায় পড়তে পড়তে বেঁচেছি কখনও বা সন্ধ্যায় নূন্যতম নিরাপত্তা ছাড়া বিকেলবেলা নদীতে নামতে হয়েছে শুটিংয়ের জন্য। ভয়ে ভয়ে প্রাণ হাতে করে। প্রতিবাদ করলে প্রথমে বাবা-বাছা করে মানানোর চেষ্টা, পরে জুটেছে তিরস্কার।”
এতটুকু ঝাঁঝ না কমিয়ে অভিনেতা আরও বললেন, “আরে আমরা যাঁরা শিল্পী, তাঁরা কি মানুষ নয়? অভিনেতা-তারকার তকমার বাইরে তো আমরাও মানুষ। কাজ আমরাও ভালবাসি। এটা তো শুধু আমাদের পেশা নয়, আমাদের প্যাশন, পরিচয় -সবকিছু। কিন্তু আমাদেরও তো জীবনের নিরাপত্তা লাগবে নাকি! আর শুনুন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রযোজকদের কোনও দোষ থাকে না। থাকে প্রোডাকশন কন্ট্রোলারদের। প্রযোজকের গুডবুকে নাম তোলার জন্য, শুটিংয়ের জন্য বরাদ্দ খরচ বাঁচায় আর সেই খরচ বাঁচানোর তালিকা থেকে যদি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নূন্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার খরচটুকু যদি বাদ যায় তো যাক! তাতে কার কী? এই তো মানসিকতা!”
এত বছর বলেননি কেন? এরকম ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেননি কেন? জবাব এল, “আপনাকে কে বলেছে করিনি? প্রতিবাদ করেছি। আমার মতো বেশ কিছু শিল্পী করেছেন। আর এই ন্যূন্যতম নিরাপোতা পাওয়ার দাবি করলেই আমরা হয়ে যাই বাজে মানুষ। অ্যারোগেন্ট, সব বোঝে-টাইপ, ওর সঙ্গে কাজ করা সমস্যার...এরকম তকমা জোটে আমাদের। পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থায় আমাদের নামে মিথ্যে রটনা করা হয় যাতে কেরিয়ার নষ্ট হয়। নোংরা রাজনীতি! অনেকে মেনে নেয়, অনেকে নেয় না। মেরুদণ্ড সোজা করা চলাটা মুশকিলের আর তাই সেইভাবে চলতে অনেকে চান না। যাঁরা চায়, তাঁরা মুশকিলে পড়ে। সোজা কথা বলছি।"
তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী? সানির স্পষ্ট জবাব – “সরাসরি কথা। যাকে বলে ডিরেক্ট কমিউনিকেশন। আর সবাইকে মানুষ বলে মনে করা। প্রযোজকের সঙ্গে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সুন্দর সম্পর্ক থাকলে বেশিরভাগ প্রোডাকশন কন্ট্রোলার, প্রোডাকশন ম্যানেজারদের গোঁসা হয়। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছেমতো রং মাখিয়ে প্রযোজকের কাছে শিল্পীদের কথা বলেন। ফলে সমস্যা বাড়ে, শুটিংয়ে গণ্ডগোল হয়। তাই সেটে সবার সঙ্গে সবার যদি যোগাযোগ ঠিকঠাক থাকে, সমস্যা ঠিক কানে পৌঁছে দেওয়া যায়, সমাধান হবে সমস্যার। সেটে কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ফিরবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”
















