আমির খান। যাঁকে বলিউডে বহুদিন ধরেই ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ নামে ডাকা হয়, প্রতিটি কাজেই নিজের সর্বস্ব ঢেলে দিতেই তিনি অভ্যস্ত। অভিনয় হোক, পরিচালনা কিংবা প্রযোজনা ছবির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর নিখুঁত হওয়ার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। তবে রুপোলি পর্দার বাইরেও সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁকে বরাবরই জনমানসে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।

সমাজসেবার কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমেই আসে তাঁর বহুল আলোচিত টেলিভিশন শো ‘সত্যমেব জয়তে’। শিশু অধিকার থেকে শুরু করে পণপ্রথার শিকার নারীদের লড়াই -সমাজের গভীর ক্ষতগুলিকে সামনে এনে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছিল এই অনুষ্ঠান। শুধু সমস্যার কথা বলাই নয়, সমাধানের পথও দেখিয়েছিল শোটি। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি সিজন সম্প্রচারিত হওয়া এই অনুষ্ঠান বিশ্বজুড়েই বিপুল সাড়া ফেলেছিল। তারপর থেকেই দর্শকদের প্রশ্ন, কেন বন্ধ হয়ে গেল ‘সত্যমেব জয়তে’? আর আদৌ কি কোনওদিন আসবে এই শো-এর নতুন সিজন?

 

 

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন আমির খান নিজেই। সম্প্রতি এক মিডিয়া সাক্ষাৎকারে তাঁকে যখন ‘সত্যমেব জয়তে’র ভবিষ্যৎ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন অভিনেতা স্পষ্ট করে বলেন, “আসলে ‘সত্যমেব জয়তে’র যে টিমটা ছিল, তারা এখন পুরোপুরি পানি ফাউন্ডেশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। এই কাজটা আমাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের সমস্ত সময় ওখানেই চলে যায়।” এর আগেও একাধিকবার একই কারণের কথা উল্লেখ করেছিলেন আমির। এর আগেও অন্য এক সাক্ষাৎকারে ‘দঙ্গল’ অভিনেতা বলেছিলেন, “‘সত্যমেব জয়তে’ টেলিভিশনে ফিরছে না, কারণ গোটা টিমটাই এখন পানি ফাউন্ডেশনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।”তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা অর্থাৎ ‘সত্যমেব জয়তে’র সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেই এই জলসঙ্কটের তীব্র সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছি। আমাদের মনে হয়, মহারাষ্ট্রকে খরামুক্ত করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।”

 

 

পানি ফাউন্ডেশন: আমির খানের আরেক লড়াইয়ের দিকেও একটু চোখ ফেরানো যাক। 

পানি ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক সংস্থা, যা মহারাষ্ট্রে খরা মোকাবিলা ও জলসংরক্ষণে কাজ করছে। আমির খান এই সংস্থাটি গড়ে তুলেছেন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী কিরণ রাও ও রীনা দত্ত এবং পরিচালক সত্যজিৎ ভাটকলের সঙ্গে যৌথভাবে। লক্ষ্য একটাই, রাজ্যের দীর্ঘদিনের জল সমস্যার স্থায়ী সমাধান।

 

এর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমির জানিয়েছিলেন, এই ফাউন্ডেশনে তাঁর ভূমিকা ঠিক কী। তাঁর কথায়, “আমাদের মধ্যে সত্যজিৎ-ই ফাউন্ডেশনের জন্য ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। আমি আমার কাজের অর্ধেক সময় দিই এখানে, আর বাকি অর্ধেক সিনেমায়। আমাদের আসল শক্তি হল একটা শক্তিশালী ভাবনা, যেটা ঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তার সঙ্গে আমি একজন তারকা, সেটাও এই কাজে কিছুটা সুবিধা এনে দেয়। আর অবশ্যই ‘সত্যমেব জয়তে’র তিনটি জনপ্রিয় সিজনের অভিজ্ঞতা।”

 

‘সত্যমেব জয়তে’ প্রসঙ্গে আমির আরও বলেন, “এই অনুষ্ঠানটা দর্শকের আবেগকে স্পর্শ করত। এটা ছিল হার্ডকোর জার্নালিজম, কিন্তু তার মধ্যেই ছিল গণযোগাযোগের শক্তি। পানি ফাউন্ডেশনেও আমরা মূলত যোগাযোগকারীর ভূমিকায়। আমরা সরকার নই, প্রশাসন নই, এমনকী প্রচলিত অর্থে এনজিওও নই। ‘ওয়াটার কাপ’-এর ডিজাইন থেকে শুরু করে আমাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, সবকিছুর মূলে রয়েছে যোগাযোগ।”

 

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ‘সত্যমেব জয়তে’ আপাতত না ফিরলেও, সমাজ বদলের লড়াই থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে দাঁড়াননি আমির খান। শুধু মঞ্চটা বদলেছে, উদ্দেশ্যটা নয়।