ঝড়ের গতিতে বাড়ছে দাম, এআই থেকে শুরু করে প্রযুক্তিতে অপরিহার্য, মানুষ কবে থেকে সোনার উপর এত ভরসা করতে শুরু করল
১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪ : ২৪
- 1
- 13
সোনা শুধু গয়না বা জলদস্যুদের গল্পের জন্যই নয়, এটি শত শত বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির একটি ভিত হিসেবে কাজ করে আসছে। আজও, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি বিপুল পরিমাণ সোনার ভান্ডার ধরে রেখেছে। উনিশ শতকের শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকার মতো দেশগুলি তাদের মুদ্রাকে সোনার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। যার ফলে একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। ১৯৩৯ সালের মধ্যে আমেরিকা ২০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি সোনা সঞ্চয় করেছিল। যার বেশিরভাগই ফোর্ট নক্সে সুরক্ষিত ছিল।
- 2
- 13
সোনা মিশরীয় থেকে শুরু করে গ্রীক ও রোমান সভ্যতাগুলিকে মুগ্ধ করেছে। প্রাচীন মিশরে সোনাকে ‘দেবতাদের মাংস’ হিসেবে গণ্য করা হত। যা ঐশ্বরিক শক্তি ও অমরত্বের প্রতীক ছিল। মিশরীয়রা সোনা দিয়ে মুদ্রা, গহনা এবং পবিত্র শিল্পবস্তু তৈরি করত। যা তাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ফ্যারাওদেরকে ধনসম্পদে পরিবেষ্টিত সোনার সার্কোফেগাসে সমাহিত করা হত।
- 3
- 13
গ্রিকরাও সোনার ঐশ্বরিক গুণাবলীর জন্য এটিকে মূল্যবান মনে করত। এটিকে অবিনশ্বর ও দেবতাদের দান বলে মানত। এর দীর্ঘস্থায়ী ঔজ্জ্বল্যের কারণে সোনা গ্রিক সমাজে চিরন্তন শক্তি ও প্রতিপত্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন চীনে সোনা ছিল এক অমূল্য সম্পদ, যা গয়না, ধর্মীয় নৈবেদ্য, মুদ্রা এবং এমনকি রাজপুত্রদের বর্মের জন্য ব্যবহৃত হত। এটি বিভিন্ন রাজবংশে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- 4
- 13
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারত সোনাকে সমৃদ্ধি এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মূল্যবান মনে করে আসছে। এটি এখনও বিবাহ, উৎসব এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রায়শই মূল্যবান পারিবারিক সম্পদ হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হস্তান্তরিত হয়। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশদের অভিযানের ফলে মেক্সিকো, পেরু এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিশাল স্বর্ণভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়। এল ডোরাডোর মতো কিংবদন্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অভিযাত্রীরা অকল্পনীয় ধনসম্পদের সন্ধানে কলম্বিয়া ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলি চষে বেড়াতেন।
- 5
- 13
আমেরিকা থেকে আসা সোনা বিশ্ব বাণিজ্যকে নতুন রূপ দিয়েছিল এবং ইউরোপে মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছিল। এটি যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন, শিল্পকে উৎসাহিত করা এবং ধনী বণিক পরিবারগুলির উত্থান ঘটিয়েছিল। উনিশ শতকে ক্যালিফোর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো জায়গায় সোনা অনুসন্ধানের হিড়িক বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল।
- 6
- 13
এর ফলে বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছিল। নতুন প্রযুক্তি ও ক্রমবর্ধমান শহরগুলির মাধ্যমে খনি শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। ভাগ্যের সন্ধানে মানুষ সোনার খনিগুলিতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলি রাতারাতি শহরে রূপান্তরিত হয়। চাহিদা মেটাতে খনি শ্রমিকরা নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছিল। যা কেবল খনি শিল্প নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিল্প ও প্রযুক্তিকেও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
- 7
- 13
উনিশ শতকের শেষে এবং বিংশ শতকের শুরুতে মুদ্রাগুলিকে সরাসরি সোনার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থাটি অর্থের উপর আস্থা বাড়ায়, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও সহজ করতে সাহায্য করেছিল। সোনার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি ব্যবস্থায় প্রতিটি কাগজের নোট রিজার্ভে থাকা প্রকৃত সোনা দ্বারা সমর্থিত ছিল। এর ফলে মানুষের মনে আস্থা তৈরি হয়েছিল যে, তাদের অর্থের একটি বাস্তব মূল্য আছে।
- 8
- 13
বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধগুলির সময় সোনা একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপদে আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। আজকের এই অনিশ্চিত বিশ্বে সোনা এখনও নিরাপদ সম্পদ। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কটের সময় এর দাম প্রতি আউন্স প্রায় ৮০০ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১১ সালের মধ্যে ১,৯০০ ডলারেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল। আর্থিক জগতে সোনা এখনও একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে চলেছে, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, জাতীয় ঋণযোগ্যতা বাড়াতে এবং সঙ্কটের সময় নিরাপত্তা হিসেবে এর ওপর নির্ভরশীল।
- 9
- 13
আমেরিকা, জার্মানি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (আইএমএফ) মতো প্রধান আর্থিক শক্তিগুলি বিপুল পরিমাণ সোনার মজুদ রাখে। এই মজুদের ফলে বিশ্ব মঞ্চে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বেশি। ২০২৬ সাল পর্যন্ত, আমেরিকা প্রায় ৮,১৩৩ মেট্রিক টন সোনার মজুদ নিয়ে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। প্রায় ৩,৩৫০ মেট্রিক টন নিয়ে জার্মানির অবস্থান দ্বিতীয়। অন্যদিকে, আইএমএফ-এর কাছে প্রায় ২,৮১৪ মেট্রিক টন সোনা রয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বিশ্বব্যাপী সোনার চাহিদা ৩% বৃদ্ধি পেয়ে ১,৩১৩ টনে পৌঁছেছে। যদিও গয়নার ব্যবহার ১৯% কমেছে, সোনার মূল্য ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে।
- 10
- 13
কিন্তু সোনা শুধু অলঙ্কার হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না। এর চমৎকার পরিবাহিতার কারণে এটি ইলেকট্রনিক্সে অপরিহার্য। এর নির্ভরযোগ্যতা ও ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য এটি মহাকাশ প্রযুক্তি ও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা যন্ত্রপাতিতে একটি অপরিহার্য উপাদান। সোনার দাম সর্বদা সরবরাহ ও চাহিদা, বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনৈতিক প্রবণতা, মুদ্রার ওঠানামা, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের পদক্ষেপ এবং এমনকি বাজারের উপর নির্ভরশীল।
- 11
- 13
নতুন খনি থেকে উৎপাদন হোক, পুনর্ব্যবহৃত সোনা হোক, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের লেনদেন হোক বা গয়না ও প্রযুক্তি শিল্পের চাহিদা, প্রতিটি কারণই এই ধাতুটির বাজারদর নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সোনা এবং মার্কিন ডলার প্রায়শই বিপরীত দিকে চলে। যখন ডলার দুর্বল হয়, তখন সোনার একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সামনে এগিয়ে আসে।
- 12
- 13
মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে সোনার কদর বেড়ে যায়। কারণ এটি মুদ্রার মূল্যহ্রাসের বিরুদ্ধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। নিম্ন সুদের হারও সোনার দর বৃদ্ধি করে বাড়ায়। যেহেতু সোনা থেকে কোনও সুদ পাওয়া যায় না, তাই যখন অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় কম থাকে, তখন এটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনা ও বিক্রি দাম এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
- 13
- 13
