আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিধানসভা নির্বাচনের আবহে ফের পাথর খাদানে ধসের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়াল বীরভূমে। মুরারই থানার গোপালপুর এলাকায় একটি পাথর খাদানে ধস নেমে অন্তত তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। গুরুতর জখম হয়েছেন আরও কয়েকজন শ্রমিক। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকালে গোপালপুর গ্রামের ওই পাথর খাদানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ জন শ্রমিক পাথর কাটার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। শ্রমিকরা খাদানের নিচে নেমে ড্রিল মেশিন দিয়ে কাজ করছিলেন। সেই সময় আচমকাই উপর দিকের মাটি ও পাথরের অংশ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে খাদানের ভেতরে কর্মরত একাধিক শ্রমিক পাথর ও মাটির নিচে চাপা পড়ে যান।

ধস নামার শব্দ পেয়ে আশপাশের অন্যান্য খাদানের শ্রমিকেরা ছুটে আসেন। তাঁরাই দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত ও চাপা পড়া শ্রমিকদের একে একে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকেই তিন শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গুরুতর জখম অবস্থায় কয়েকজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

ঘটনায় আহত শ্রমিক মনো মোসাই বলেন, "আমরা খাদানের নিচে কাজ করছিলেন। আচমকাই উপরের মাটি ধসে পড়ে যায়। মোটামুটি ১৪জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। হঠাৎ ধস নামায় শ্রমিকরা মাটির নিচে চাপা পড়ে যান। পরে অন্য শ্রমিকেরা এসে তাঁদের উদ্ধার করেন এবং আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।" তাঁর কথায়, ব্লাস্টিং হচ্ছিল না, মাটিই আচমকা ধসে পড়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, যে পাথর খাদানে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটির মালিক বীরভূম জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ সেরাজুল ইসলাম। আর এই ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।

বিজেপি নেতা দীপক দাস এই ঘটনাকে ঘিরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বীরভূমে বহু পাথর খাদান কোনও নিয়মনীতি না মেনেই চালানো হয়। তিনি দাবি করেন, যে খাদানে ধস নেমেছে সেটি তৃণমূল নেতার মালিকানাধীন। তাঁর কথায়, পলিউশন বা সুরক্ষা—কোনও নিয়মই মানা হয় না, শুধুমাত্র লাভের জন্য এই খাদানগুলো চালানো হচ্ছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই নাকি বীরভূম জুড়ে তৃণমূলের ধস নামার ইঙ্গিত মিলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বিজেপি নেতা ধ্রুব সাহাও এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিধানসভা নির্বাচনের মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট ইতিমধ্যেই জারি হয়েছে। পুলিশের যদি সৎ সাহস থাকে, যদি সত্যিই কোনও তৃণমূল নেতার খাদানে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা উচিত। তাঁর দাবি, অবৈধ খাদান এবং নিরাপত্তাহীন কাজের পরিবেশের জন্যই এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। মৃত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও সরকারি চাকরির দাবিও জানান তিনি।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় এই ঘটনায় সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি জানান, বিষয়টি এখনও তাঁদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছয়নি। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখতে হবে। তবে যদি সত্যিই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে প্রথম কাজ হবে আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি পুরো ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মত তাঁর।

সব মিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে ঘিরে বীরভূমের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র তরজা। একদিকে বিজেপির অভিযোগ ও গ্রেপ্তারের দাবি, অন্যদিকে তৃণমূলের তদন্তের কথা—এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।