আজকাল ওয়েবডেস্ক: এযেন দেশভাগের এক খণ্ডচিত্র! মাথায় করে 'সংসার' নিয়ে দীর্ঘ যাত্রায় পাড়ি দিচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। তবে দেশভাগের সময়ের সঙ্গে এই চিত্রের পার্থক্য হল এখানে বেশিরভাগ জায়গায় শিশু বা মহিলারা নেই। আর যাঁরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পথে নেমেছেন তাঁদের গন্তব্যও অজানা নয়। 


ভোট মিটতেই ফের একবার মুর্শিদাবাদ জেলার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক পাড়ি দিতে শুরু করেছেন নিজেদের কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। তাই জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে জমছে কালো মাথার ভিড়। 


বহু 'লড়াই- যুদ্ধের' পর যাঁদের নাম এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকায় উঠেছিল তাঁরা নিজেদের নাগরিকত্বের 'প্রমাণ' এবং 'দলিল' রাখতে জীবন বাজি রেখে প্রচুর কষ্ট এবং অর্থ ব্যয় করে ফিরে এসেছিলেন নিজেদের গ্রামের বুথে। যাতে অন্তত এবারের নির্বাচনে ভোটটা দিতে পারেন। তার ফলে মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামের যে বুথগুলোতে  সাধারণ নির্বাচনে ৭০ শতাংশ ভোট পড়তো না এবার সেখানে প্রায় সমস্ত বুথেই ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। 


ভোট শেষ, এবার ফের একবার রুজি রুটির টানে নিজেদের কর্মস্থলে ফেরার পালা। তাই গত কয়েকদিন ধরেই মুর্শিদাবাদের লালগোলা, ফরাক্কা ,জঙ্গিপুর ,সাগরদিঘি, আজিমগঞ্জ-এর মত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে সকাল থেকেই উপচে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পিঠে একটা ব্যাগ, হাতে কিছু জিনিসপত্র এবং বাড়ির লোকের রান্না করে দেওয়া খাবার নিয়ে ফের একবার ভিন'দেশে' রওনা হতে শুরু করে দিয়েছেন মুর্শিদাবাদ জেলার পরিযায়ী শ্রমিকেরা, যাঁদের হাতের কাজ গোটা ভারত বিখ্যাত। 


মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা এলাকার বাসিন্দা নিজাম শেখ হায়দরাবাদের একটি এলাকায় বোরখা তৈরির কাজ করেন। এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য বহু কষ্ট করে দু'বার তাঁকে বাড়ি আসতে হয়েছিল। নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন," বাড়ির লোক বলেছিল এবার ভোট দিতেই হবে। না হলে পরে হয়তো আর এই দেশের নাগরিকই থাকবো না। তাই হায়দরাবাদ থেকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ট্রেনে করে ভোটের আগেই বাড়ি ফিরেছি।"


হায়দরাবাদ থেকে কলকাতা আসার সেই দুঃসহ যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,"ট্রেনের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা। কিন্তু 'এজেন্ট'কে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা করে দিয়ে আমরা ৮ জন টিকিট কেটেছিলাম। প্রায় ২৮ ঘণ্টার সেই যাত্রায় ট্রেনে নিজের আসন ছেড়ে 'টয়লেট' পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা ছিল না। অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক দাঁড়িয়ে এবং বসে প্রায় ২৮ ঘণ্টার যাত্রা করে নিজের নিজের বাড়ি ফিরেছেন। দীর্ঘ এই যাত্রায় আমরা ট্রেন থেকে নেমে কিছু কিনে খেতেও পারিনি।"


ফেরার সময়ও প্রায় একই রকমের সমস্যা হবে বলে মনে করছেন মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের পরিযায়ী শ্রমিক মীর মহম্মদ হোসেন। গত কয়েক বছর ধরে কেরালায় একটি জায়গায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন তিনি। মীর বলেন," খুব কষ্ট করে বাড়ি ফিরেছি। খাবার কেনার জন্য আমার মত অনেকেই ট্রেন থেকে নামতে পারেনি। তাই এবার বাড়ি থেকেই কিছু রান্না করা এবং শুকনো খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। যাতে অন্তত দীর্ঘ এই ট্রেন যাত্রায় খাবারটুকু পাই।"


তবে ঝাড়খন্ড, বিহারের মতো প্রতিবেশী রাজ্যে মুর্শিদাবাদের যে সমস্ত পরিযায়ী  শ্রমিকেরা ফেরিওয়ালা বা নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা আর নিজেদের পূর্ব অভিজ্ঞতার জন্য ট্রেনে করে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। সুতির বাসিন্দা আজাদ শেখ বলেন,"ভোট দেওয়ার জন্য ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার সময় প্রচন্ড সমস্যায় পড়েছি। প্রচুর পরিযায়ী শ্রমিক ভিড়ের জন্য ট্রেনে চাপতেই পারিনি। না, হলে হয়তো তাঁরাও ভোট দিতে আসতে পারতো। "তিনি বলেন," সেই কারণে আমরা বেশ কিছু পরিযায়ী শ্রমিক একসঙ্গে টাকা দিয়ে একটি বাস ভাড়া করে নিজেদের কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছি।"

 

&t=123s
ফরাক্কা স্টেশন থেকে দিল্লীমুখী ট্রেনে চড়ার আগে মীর বাদাম আলি বলেন," পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখার জন্যই এত কষ্ট করা। ভোট দিয়ে গেলাম, কিন্তু মনটা বাড়িতেই থাকল। জানি না বখরি ইদের সময় বাড়িতে ফিরতে পারবো কিনা। দিল্লি থেকে এবার বাড়ি ফেরার সময় ট্রেনে যে ভিড় ছিল তা আমার সব পূর্ব অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। দিল্লি থেকে আসার পথে আমি নিজে দেখেছি ট্রেনের সাধারণ কামরায় দীর্ঘ ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে অনেক পরিযায়ী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার জন্য আরও বেশি ট্রেনের বন্দোবস্ত করা। ফেরার সময়ও আমাদের জন্য অতিরিক্ত ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কোনওরকমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফের আমরা নিজেদের কর্মস্থলের দিকে ফিরে যাচ্ছি।"