আজকাল ওয়েবডেস্ক: পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের চিনিসপুর গ্রামের বাসিন্দা রেণু খাতুন—একটি নাম, যা শুধু একজন মানুষের পরিচয় নয়, বরং এক অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। চার বছর আগে যে নারী নিজের জীবন বাঁচাতে, সম্ভ্রম রক্ষা করতে এবং নতুন করে দাঁড়াতে এক অসম লড়াই শুরু করেছিলেন, সেখানে আজ তিনি আবার নতুন এক সঙ্কটের মুখে। অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তাঁর নাম।
ঘটনাটি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে। রেণুর দাবি, কেতুগ্রামের চিনিসপুরের ৩৩ নম্বর বুথে তাঁর নাম বহুদিন ধরেই ছিল। কিন্তু সম্প্রতি অতিরিক্ত ভোটার তালিকা পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর নাম ২২৮ নম্বরে থাকলেও সেটি ‘বিয়োজনের তালিকা’-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, কার্যত তাঁর ভোটাধিকারই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
রেণু খাতুনের জীবনসংগ্রাম কোনও সাধারণ গল্প নয়। ২০২২ সালের ৪ জুন রাতে সন্দেহের বশে তাঁর স্বামী শের মহম্মদ ও তার সঙ্গীরা নির্মমভাবে তাঁর হাতের কব্জি কেটে নেয়। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়ত থেমে যাবে এক নারীর জীবনযুদ্ধ। কিন্তু রেণু হার মানেননি। অসাধারণ মানসিক শক্তি এবং বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে তিনি আবার উঠে দাঁড়ান।
চিকিৎসার পর মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিনি বাঁ হাতে লেখা শুরু করেন—যা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই লড়াইয়ের মধ্যেই তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সহানুভূতি ও সহায়তা পান। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এরপর ধীরে ধীরে নতুন করে জীবন গড়ার পথ শুরু হয় রেণুর। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে তাঁর জন্য কৃত্রিম হাতের ব্যবস্থা করা হয় পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি, তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নার্সিংয়ের চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি নার্সিং হস্টেলের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। নিজের অন্ধকার অতীতকে পিছনে ফেলে অন্যের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, তাঁর উপর অত্যাচারের ঘটনায় কাটোয়া মহকুমা আদালতে বিচারাধীন। অর্থাৎ, একদিকে যেমন আইনি লড়াই, অন্যদিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সংগ্রাম—দু’দিকেই সমানতালে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রেণু। কিন্তু এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও থামেনি তাঁর পরীক্ষা। এবার তাঁর অস্তিত্বই যেন প্রশ্নের মুখে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তাঁর কথায়, “প্রায় চার বছর ধরে নিজেকে বাঁচানো, সম্মান রক্ষা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই করেছি। সেই লড়াইয়ের একটা ধাপ পেরিয়েছি। আর তখনই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ চলে গেল! এবার তো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।”
তিনি বলেন, “আমি আশা করি, এই লড়াইয়েও মুখ্যমন্ত্রী আমার পাশে থাকবেন।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি এখনও আশা হারাননি। বরং নতুন করে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই শুরু করেছেন।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে, বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে একটি নাম বাদ পড়া শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। ভোটাধিকার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা কেড়ে নেওয়া মানে তাঁর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।
রেণু খাতুনের ঘটনা তাই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের কাহিনী নয়, এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, একটি নাম মুছে যাওয়া মানে শুধু একটি ভোট হারানো নয়—এটি একটি সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলার সামিল। আজ রেণু আবার লড়াইয়ের ময়দানে। তবে এবার তাঁর লড়াই নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার জন্য, নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। সমাজের বিভিন্ন মহল ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— যে নারী এত প্রতিকূলতার মধ্যেও হার মানেননি, তাঁর নাম কি আবার ফিরবে ভোটার তালিকায়? তাঁর এই নতুন লড়াই কি আবার এক নতুন জয়ের গল্প লিখবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।















