আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বীরভূম জেলা মানেই বরাবরই তার নিজস্ব রাজনৈতিক ভাষা এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মণ্ডল। বিধানসভা, লোকসভা কিংবা পঞ্চায়েত—যে কোনও নির্বাচনের আগে তাঁর মুখে কী ‘দাওয়াই’ শোনা যাবে, সেদিকেই নজর থাকত রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের। ‘গুড় বাতাসা’, ‘ঢাকের চড়াম চড়াম’—এইসব শব্দবন্ধ শুধু রাজনৈতিক ভাষা নয়, বরং এক ধরনের শক্তির প্রদর্শন হিসেবেই ধরা হত। বিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হত বলেও অভিযোগ ছিল। পরবর্তীকালে ‘খেলা হবে’ স্লোগান রাজ্যজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় এবং তা নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

তবে সময় বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক মেজাজও। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে অনুব্রত মণ্ডল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সংযত। কিন্তু রাজনীতির উত্তাপ কমেনি, বরং বিরোধী শিবির থেকে নতুন ভাষা ও নতুন 'হুমকি'র বার্তা উঠে আসছে। সেই প্রেক্ষিতেই বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ দাওয়াই এখন বীরভূমের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বুধবার সিউড়িতে বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় এলে যে যেমন অপরাধী, তাকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া শুরু হবে। আমরা ক্ষমতায় আসার ঠিক তিন মাসের মধ্যে এই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া শুরু হয়ে যাবে। কাউকে দেওয়া হবে কড়া ডোজ, কাউকে দেওয়া হবে মৃদু ডোজ। আবার কাউকে হয়ত অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই শুধুমাত্র ক্যালপল দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে”—অর্থাৎ যার যেমন প্রয়োজন, তাকে সেই ধরনের ‘ওষুধ’ দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থাকেই তিনি ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কথায়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে একযোগে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সেই পদক্ষেপ অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। বড় অপরাধীদের জন্য থাকবে কড়া ডোজ, তুলনায় ছোট অপরাধীদের জন্য অপেক্ষাকৃত হালকা ব্যবস্থা, আর সামান্য ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে নরম পন্থা নেওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, আইন-শৃঙ্খলা ইস্যুকে সামনে রেখেই ভোটের ময়দানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে বিজেপি।

&t=1s

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বীরভূমের মাটিতে এই ধরনের ভাষা নতুন কিছু নয়। তবে ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ শব্দের ব্যবহার এক নতুন প্রতীক তৈরি করেছে। এটি একদিকে যেমন কঠোর প্রশাসনিক বার্তা বহন করছে, অন্যদিকে তৃণমূলের অতীত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে এক ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরছে।

যদিও এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় এই মন্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “এই ধরনের কথার কোনও  উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। মানুষের নিজের নিজের ভাষা ও ব্যবহারই তার পরিচয় বহন করে। তিনি আরও বলেন, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল বলতে যা বোঝায়, এই বক্তব্যও ঠিক তেমনই—আগাম বড় বড় কথা বলা হচ্ছে। মানুষ সবকিছু দেখছে এবং ৪ তারিখে তারই জবাব দেবেন।

তিনি আরও বলেন, দেশে ইতিমধ্যেই ফৌজদারি আইনের পরিবর্তন হয়েছে, নতুন কাঠামো চালু হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে এবং বিচারব্যবস্থা তার বিচার করবে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নতুন করে এই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেই তাঁর মত।

সব মিলিয়ে, বীরভূমের রাজনীতিতে ‘গুড় বাতাসা’ থেকে ‘অ্যান্টিবায়োটিক’—এই পরিবর্তন শুধুমাত্র শব্দের নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশলেরও পরিবর্তন। একদিকে পুরনো দাপটের স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন আক্রমণাত্মক বার্তা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই গড়ে উঠছে এবারের নির্বাচনী আবহ। এখন দেখার, এই নতুন রাজনৈতিক ভাষা ভোটের বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের রায় কোন দিকে যায়।