গোপাল সাহা
শহরে ঘুরবে গাড়ি, চলবে ক্যামেরা। গাড়ির উপরে বসানো হয়েছে ক্যামেরা। দূর থেকে আচমকা বোঝার উপায় নেই ওটা কী। আমাদের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী উল্টোডাঙার হাডকো মোড়ে এরকমই একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন গুগলের ম্যাপ আপডেট করার গাড়ি বোধহয়। কিন্তু পরে তাঁর ভুল ভাঙে।
ভোটের বাংলায় কোনও রকম অশান্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। নেওয়া হবে কঠিন থেকে কঠিন পদক্ষেপ। আর সেই কথাকে মাথায় রেখে আরও একধাপ এগিয়ে অভিনব পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের। এবার রাজ্য জুড়ে সুরক্ষার জন্য আটোসাটো ব্যবস্থা। যেমন কেন্দ্রীয় বাহিনী সুরক্ষা থাকবে, পাশাপাশি নজরদারি থাকবে ওয়েবকাস্টিংয়ের মাধ্যমে। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে সিসিটিভির মাধ্যমে। শহর তথা রাজ্যজুড়ে যে সমস্ত গাড়িগুলিকে নির্বাচন কমিশন নিজেদের আওতায় নিয়েছে সেই গাড়িগুলির ছাদে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। যার মাধ্যমে শহরে বা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যাতে কোনও অবস্থায় কোনও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন না হয় এবং অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার নজরদারি রাখতেই এই ব্যবস্থা।
সংবিধানের আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মতো সাধারণ নাগরিকের গাড়ি নিজের অধীনে নিতে পারে। তবে তার জন্য রয়েছে বেশ কিছু আইনানুগ ধারা ও নিয়মাবলী। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নির্বাচন কমিশনের ব্যক্তিগত গাড়ী বাজেয়াপ্ত করার নিয়ম।
২০০৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে অনির্বাণ ঘোষের করা একটি মামলার ভিত্তিতে আদালত তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছে যে, Representation of the People Act, 1951-এর ধারা ১৬০ অনুযায়ী ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গাড়ি রিকুইজিশন করার ক্ষমতা নির্বিচারে বা ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ অনুসন্ধান, আইনি ভিত্তি এবং Conduct of Election Rules, 1961-এ নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করেই ব্যক্তিগত গাড়িগুলি রিকুইজিশন করেছিল। গাড়িগুলি রাস্তার উপর আটকানো হয় এবং চালকদের নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়, যা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ 14-A বর্ণিত ন্যায্যতা ও যুক্তিসঙ্গতার নীতির লঙ্ঘন হিসেবে আদালত বিবেচনা করে।
আদালতের রায়ে আরও বলা হয়, সাধারণত শুধুমাত্র পাবলিক সার্ভিস ভেহিকল বা ট্রান্সপোর্ট ভেহিকল-ই রিকুইজিশন করা যেতে পারে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি নয়। ফলস্বরূপ, চ্যালেঞ্জ করা সমস্ত রিকুইজিশন আদেশ বাতিল করা হয়।
এই বিষয়ে আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী রাজনীল মুখার্জি বলেন, “গণপ্রতিনিধিত্ব আইন-এর ধারা ১৬০ অনুযায়ী, জেলাশাসকের তরফ থেকে একটি নির্দিষ্ট লিখিত আদেশ থাকা আবশ্যক। উক্ত আদেশ অনুযায়ী গাড়ির মালিককে একটি নোটিশ প্রদান করতে হবে এবং সেই নোটিশ যথেষ্ট পূর্বে পাঠানো উচিত। নোটিশটি গ্রহণ করা প্রয়োজন হলেও, ব্যক্তিগত যানবাহন নির্বাচন কাজে প্রদান করবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গাড়ির মালিকের উপরই নির্ভর করে।” তিনি আরও বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা হাইকোর্ট এই ধরনের অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে মত প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, যেসব গাড়ি জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত রয়েছে অথবা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেসব গাড়ি নির্বাচন কাজে অধিগ্রহণ করা যেতে পারে না।”

এই ভদ্রলোকের গাড়ির ছাদে বসানো হয়েছে ক্যামেরা। নিজস্ব চিত্র।
এই বিষয়ে একজন গাড়িচালককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের গাড়িকে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কমিশন গাড়ির ওপরে ক্যামেরা সেট করেছে নজর রাখার জন্য। গাড়ি যেভাবে যেমন ঘুরবে, তেমনি ভাবেই এই ক্যামেরার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সেই সমস্ত জায়গার নজরদারি করবে বলেই শুনেছি।”














