আজকাল ওয়েবডেস্ক: বহরমপুর মানেই 'অধীর’। গত আড়াই দশকের এই রাজনৈতিক সমীকরণে এবার বড় ধাক্কা লাগল। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দ্বিতীয়বার বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের মুখ দেখলেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে বহরমপুর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী সুব্রত মৈত্রের কাছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন তিনি।

 

অধীরের রাজনৈতিক গ্রাফে ছন্দপতনের শুরু হয়েছিল ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন থেকেই। টানা পাঁচবারের সাংসদ অধীরকে সেবার বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে হারিয়ে দেন তৃণমূল কংগ্রেসের তারকা প্রার্থী ইউসুফ পাঠান। লোকসভার সাংসদ পদ হাতছাড়া হওয়ার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদও হারাতে হয় তাঁকে। পরপর দুই ধাক্কায় কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই নেতা।

 

তবু হাল ছাড়েননি ‘বহরমপুরের রবিনহুড’। ভোটের রাজনীতিতে পোড় খাওয়া এই নেতা আঁকড়ে পড়েছিলেন নিজের 'গড়', মুর্শিদাবাদ। তাঁর তিন দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ভরসা রেখে কংগ্রেস হাইকমান্ডও ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্রে থেকে তাঁকেই প্রার্থী করে। এর পাশাপাশি অধীরের উপরই জেলার বাকি ২১টি কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থীদের নাম ঠিক করার দায়িত্বও দিয়েছিলো কংগ্রেস হাইকমান্ড। 

 

কিন্তু লোকসভার পর এবার বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে ডাহা ফেল করলো ‘অধীর-ম্যাজিক’। সোমবার বহরমপুর গার্লস কলেজে ভোট গণনা শুরুর পর থেকেই পিছিয়ে পড়েন অধীর। শেষ পর্যন্ত বিজেপির সুব্রত মৈত্রের কাছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে হার মানতে হয় তাঁকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হারের নেপথ্যে রয়েছে তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ। 

 

২০২৪-এর লোকসভার পর ২০২৬-এর বিধানসভাতেও বহরমপুরে ভোট ভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। আর সেই মেরুকরণের অঙ্কেই কার্যত অচল হয়ে গিয়েছে একসময়ের ‘অধীর-ম্যাজিক’। হিন্দু ভোটার অধ্যুষিত বহরমপুর বিধানসভার সিংহভাগ ভোটই বিজেপি প্রার্থী ঝুলিতে গিয়েছে। অধীরবাবু নিজে যেমন বহরমপুর কেন্দ্র থেকে জিততে পারেননি, তেমনই তাঁর 'আশীর্বাদধন্য' প্রায় কোনও কংগ্রেস প্রাথীই মুর্শিদাবাদ জেলায় খাতা খুলতে পারেননি। ব্যতিক্রম কেবল ফরাক্কা। সেখানে কংগ্রেস প্রার্থী মাহাতাব শেখ প্রায় ৮ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন।   

ইতিহাস পাতা উল্টালে দেখা যায় অধীর চৌধুরীর 'সক্রিয়' রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু ১৯৯১ সালে। সেবার নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিটে প্রথমবার ভোটে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু সেই নির্বাচনে পরাজিত হন। শুধু তাই নয়, সেবার ভোটের দিন নবগ্রামের বাঘিরা নামক এলাকায় বিরোধী বাম সমর্থকরা তাঁকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর দীর্ঘদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয় তাঁকে।

 

পাঁচ বছর পর, ১৯৯৬ সালে সেই নবগ্রাম থেকেই ফের ভোটে লড়েন অধীর। নবগ্রামবাসীরা এখনও বলেন, ৯৬-এর ভোটে অধীরকে প্রচারই করতে দেওয়া হয়নি । পুলিশের খাতায় 'পলাতক' অবস্থায় বাধ্য হয়ে গ্রামে গ্রামে অধীরের বক্তব্য রেকর্ড করে ভোটারদের শোনাতেন অধীর ঘনিষ্ঠরা। কিন্তু সব বাধা টপকে সেবার জয় ছিনিয়ে নেন তিনি। প্রথমবার পা রাখেন বিধানসভায়।

 

তবে বিধায়ক হিসেবে তাঁর ইনিংস ছিল মাত্র তিন বছরের। ১৯৯৯ সালে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতে দিল্লির রাজনীতিতে পা রাখেন অধীর। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। টানা ২৫ বছর বহরমপুরের সাংসদ, লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি — একের পর এক শিখর ছুঁয়েছেন অধীর চৌধুরী।

 

২০২৪-এ লোকসভা, ২০২৬-এ বিধানসভা, পরপর দু’বার বহরমপুরে হার। প্রায় ৪০ বছরের 'সক্রিয়' রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম এত বড় প্রশ্নের মুখে অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক 'ক্যারিশমা'। ‘বহরমপুরের রবিনহুড’ তকমা পাওয়া এই নেতা কি এবার রাজনীতির মূলস্রোত থেকে সরে দাঁড়াবেন? নাকি ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন? উত্তরের অপেক্ষায় রইল বঙ্গবাসী। 

 

বহরমপুর কেন্দ্র থেকে জয়ের পর বিজেপির সুব্রত মৈত্র বলেন, "এই কেন্দ্রের ভোটাররা অধীরবাবুর মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। এই জয় নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি কর্মীদের উৎসর্গ করছি।" তবে পরাজয়ের খবর মেলার পর থেকে অধীরবাবু এখনও সংবাদমাধ্যমের অধরাই রয়ে গিয়েছেন।