জয়ন্ত ঘোষাল: ভোট যত এগিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ ততই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে। কত রঙ্গ দেখছি এই বাংলায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিজেপি কখনোই দু-দুটো আসনে একজন প্রার্থীকে টিকিট দেয়নি। এবার সেক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী শুধু নন্দীগ্রাম নয়, ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে প্রার্থী হলেন। বিজেপি তাদের প্রথম তালিকাতেই শুভেন্দু বাবুর নাম ভবানীপুর আসন থেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করল। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই অবশ্য শুভেন্দু বলেছিলেন যে, আমি ভবানীপুরের প্রার্থী হব। মমতা ব্যানার্জি যেখানে যাবেন, সেখানে আমি পৌঁছব। নন্দীগ্রামে মমতা ব্যানার্জিকে ১,৯৫৬ ভোটে পরাস্ত করার পর তিনি ভবানীপুরের প্রার্থী হয়ে বিজেপির পালে বাতাস তুলতে চাইছেন। 

কিন্তু কেন? শুভেন্দু অধিকারী এত বড় ঝুঁকি নিয়ে এমন একটা কাণ্ড করে বসলেন কেন? এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কাহিনি কী? শুভেন্দুর নাম যখন ঘোষিত হল সোমবার তখন মমতা ব্যানার্জি ধর্নামঞ্চে। তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন। পদযাত্রা করছেন। মমতা ব্যানার্জি নিজে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাননি। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ, শুভেন্দুর এই সিদ্ধান্তের হঠকারিতাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছেন। 

কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী? বিজেপির বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এবং আলাপ-আলোচনার পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শুভেন্দু বাবুকে ভবানীপুর থেকে প্রার্থী হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। প্রথমে প্রস্তাব ছিল, নন্দীগ্রামে না দাঁড়িয়ে ভবানীপুর থেকে প্রার্থী হওয়ার। কিন্তু সেই ঝুঁকি শুভেন্দু বাবু নিতে চাননি। নন্দীগ্রামের বদলে ভবানীপুর থেকে দাঁড়ালে এবং তারপর নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির কাছে পরাস্ত হলে শুভেন্দু বাবু দু'দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। আবার ভবানীপুর থেকে প্রার্থী না হলে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব শুভেন্দুকে বলেন, সেক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস বলবে যে, এত ঢক্কানিনাদের পর এই লঘুক্রিয়া কেন? একেই তো বলে ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’৷ 

এত হুঙ্কার দিয়ে ভবানীপুরে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে পারল না শুভেন্দু অধিকারী। অতএব, কৌশলগত ভাবে ভোটের ফলাফল বেরনোর পর নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে নিলেও ভোটের আগে বিজেপি শুভেন্দুকে দাঁড় করিয়ে বাজার গরম করছে। যারপরনাই সক্রিয় হয়ে উঠল। ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করার পেছনে তাই বিজেপির যে কৌশল গুলো আছে, তার প্রথম কারণ হল - 
প্রথমত, মমতা ব্যানার্জিকে কিছুটা হলেও ভবানীপুর কেন্দ্রে আটকে রাখার চেষ্টা। ভবানীপুরে অবাঙালি হিন্দিভাষী মাড়োয়ারি, গুজরাটি, এমনকী বিহারী ভোটব্যাংক আছে যথেষ্ট। এই ভোটব্যাংক অধ্যুষিত এলাকা গুলিতে গতবারের ভোটেও বিজেপির শতকরা ভোটব্যাংক খুব খারাপ ছিল না। কয়েকটি ওয়ার্ড  বিজেপি যথেষ্ট এগিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু সার্বিকভাবে ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জি বিজেপির প্রার্থী মহিলা আইনজীবী দলের মুখপাত্র তাঁকে পরাস্ত করেছিলেন অনেক ভোটে। এবার শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে প্রার্থী হওয়ায় অতিরিক্ত প্রচার পাবেন। মমতা বনাম শুভেন্দু- এই প্রচার তুঙ্গে উঠবে।  

দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নন। মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন,  তা নিয়ে বিজেপির মধ্যে কোন্দল আছে। আবার মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। বারবার আলোচনায় উঠে আসছে যে, মমতার বিরুদ্ধে বিজেপির একটা মুখ নেই, অনেক গুলো মুখ আছে। কিন্তু মমতার বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করে বিজেপি প্রত্যক্ষ ভাবে না দিলেও পরোক্ষভাবে এই বার্তাটা দিচ্ছেন যে, বিরোধী দলনেতাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রধান মুখ। শুভেন্দু সুকৌশলে অমিত শাহ-র আশীর্বাদ নিয়ে এই কাজটি করতে সক্ষম হলেন। 

তৃতীয়ত, বিজেপি জিতুক আর হারুক, ভোটের আগে এই সিদ্ধান্ত, এই প্রচার রাজ্যে বিজেপির পক্ষে একটা হাওয়া তুলতে সক্ষম হবে বলে মনে করছে শীর্ষ নেতৃত্ব। কারণ, রাজ্যপাল বদল। এসআইআর-এর মাধ্যমে প্রচুর ভোটারের নাম বাদ যাওয়া, যে সব বিতর্কিত ভোটার রয়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও টানাপোড়েন চলছে। আর এসবের মধ্যে ভোট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজি, পুলিশ কমিশনার দু'দিনে প্রচুর আমলাদের ব্যাপক রদবদল করেছে। সবমিলিয়ে প্রশাসনে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে বিজেপি। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রের সমর্থন নিয়েই সেটা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। বিজেপি সূত্র বলছে— এ হল স্নায়ুর যুদ্ধ। বাস্তব যুদ্ধে কিছু হোক আর না হোক, স্নায়ুর যুদ্ধে আপাতত তৃণমূলের রণহুঙ্কারকে কিঞ্চিৎ স্তিমিত করতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। 

তবে এত কাণ্ড করার পরেও মূল প্রশ্নটা হল— পশ্চিমবঙ্গের মানুষ- তারা কাকে ভোট দেবেন? এতকিছুর পরেও কি বলা যায় যে, বিজেপি মমতা ব্যানার্জির সরকারকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবেন? এখনও কি বলা যায়, মানুষ বিজেপির এই চমক-ধমক দেখে খুশি? তাদেরও কি মনে হচ্ছে না যে, ক্ষমতা দখল করার জন্য বিজেপি যেনতেন প্রকারেণ যে সমস্ত কাণ্ডকারখানা করছে, তার সবটাই সমর্থনযোগ্য নয়?