আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিগত কয়েক মাস ধরেই শেয়ার বাজার বেশ অস্থির। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমেরিকার সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সংঘাত এবং বিদেশি পুঁজির অব্যাহত বহিঃপ্রবাহ - এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বিনিয়োগের একটি অতি সাধারণ মাধ্যম ফিক্সড ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানত চুপিসারে আবারও নিজের গুরুত্ব ফিরে পাচ্ছে।

আরবিআই-এর অবস্থান এবং আমানতকারীদের ওপর এর প্রভাব
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে, আরবিআই রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে এবং একটি 'নিরপেক্ষ' অবস্থান বজায় রেখেছে। মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকি এখনও উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও, আরবিআই-এর এই পদক্ষেপ সুদের হারের চক্রে একটি 'বিরতি' বা স্থিতাবস্থা বজায় থাকার ইঙ্গিত দেয়। আমানতকারীদের জন্য এর অর্থ হল, ব্যাঙ্কগুলো সম্ভবত এখনই আমানতের ওপর সুদের হার কমাবে না, ফলে বর্তমানের উচ্চ সুদের হারগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য 'লক' বা নিশ্চিত করে নেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমান সুদের হারের একটি পর্যালোচনা
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলো বর্তমানে নির্দিষ্ট মেয়াদের আমানতের ওপর বার্ষিক প্রায় ৭% থেকে ৭.৫% হারে সুদ দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি ব্যাঙ্কগুলোর সুদের হার ৬.৫% থেকে ৭%-এর সীমার মধ্যে রয়েছে। ক্ষুদ্র অর্থলগ্নি ব্যাংকগুলো অবশ্য আরও বেশি হারে সুদ দিচ্ছে, যা নির্দিষ্ট কিছু মেয়াদের ক্ষেত্রে বেড়ে ৮% থেকে ৮.৫% পর্যন্ত। প্রবীণ নাগরিকরা সাধারণত এই হারগুলোর ওপর অতিরিক্ত ০.২৫% থেকে ০.৫০% হারে সুদ পাওয়ার সুবিধা পেয়ে থাকেন।

১ বছরের মেয়াদের ওপর ৭.২৫% হারে সুদ পাওয়া গেলে, ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ৭,২৫০ টাকা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। ফলে মেয়াদ শেষে মোট প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,০৭,২৫০ টাকা। সুদের হার বেড়ে ৮.২৫% হলে, একই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসে ৮,২৫০ টাকা এবং মেয়াদ শেষে মোট প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,০৮,২৫০ টাকা। 

দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, 'চক্রবৃদ্ধি সুদের' প্রভাবে এই পার্থক্যের ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, ৩ বছরের মেয়াদের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ টাকার বিনিয়োগে ৭.২৫% এবং ৮.২৫% সুদের হারের মধ্যকার পার্থক্য ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সুদের হারের মাত্র ১ শতাংশ পার্থক্যও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

রিটার্ন বনাম মুদ্রাস্ফীতি: প্রকৃত রিটার্নের পূর্বাভাস
সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা বা নিশ্চয়তাযুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমগুলো এখনও বেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। 'প্রবীণ নাগরিক সঞ্চয় প্রকল্প'  বর্তমানে ৮.২% হারে সুদ প্রদান করছেয অন্যদিকে, 'পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড' (পিপিএফ) ৭.১% হারে কর-মুক্ত সুদ প্রদান করছে। তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মুদ্রাস্ফীতির বিষয়টিও অবশ্যই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিপিআই মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩.২%, কিন্তু আরবিআই এই বছরের জন্য ৪.৬% পূর্বাভাস দিয়েছে, যা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে প্রায় ৫.২%-এর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবে। এটি প্রকৃত রিটার্নকে সংকুচিত করে, তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন না করে মেয়াদপূর্তির কাছাকাছি থাকা আমানতগুলো পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার কি বিনিয়োগ করা উচিত, এবং কীভাবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিক্সড ইনকামে বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত, কিন্তু এর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। একটি ল্যাডারিং কৌশল রিটার্ন এবং তারল্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। 

উদাহরণস্বরূপ, ৫ লক্ষ টাকাকে ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদী পাঁচটি ১ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিটে ভাগ করা যেতে পারে, যেখানে সুদের হার প্রায় ৭% থেকে ৭.৬%। ১-বছরের ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রায় ৭,০০০ টাকা আয় হয় এবং মেয়াদপূর্তিতে তা একটি দীর্ঘ মেয়াদের আমানতে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। এটি বার্ষিক তারল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাকি টাকাকে উচ্চ হারে চক্রবৃদ্ধি হতে দেয়। যেহেতু প্রতিটি ব্যাঙ্কে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আমানত ডিআইসিজিসি দ্বারা বিমাভুক্ত, তাই বিভিন্ন ব্যাঙ্কে তহবিল ছড়িয়ে রাখলে বিনিয়োগের সুরক্ষা আরও বাড়ানো যেতে পারে।

ফিক্সড ডিপোজিট হয়তো সর্বোচ্চ রিটার্ন দেয় না, কিন্তু অনিশ্চিত বাজারে মূলধন সুরক্ষা এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো স্থিতিশীলতা প্রদান করে এবং একটি সুষম পোর্টফোলিওর প্রাসঙ্গিক অংশ হিসেবে থাকে।

(এই নিবন্ধটি লিখেছেন ব্যাঙ্কবাজারের সিইও আধিল শেঠি।)