আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঐতিহাসিক দিক থেকে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত এলাকা সাগরদিঘি। বাংলায় 'পাল' সাম্রাজ্যের আমলে ৭৫০ -১১৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে বাংলায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার হয় বলে জানা যায়। পাল রাজাদের মধ্যে মহিপাল এই এলাকাকে বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তেরোশো শতাব্দীতে 'পাঠান' শাসনের সময়ও সাগরদিঘির ব্যাপক গুরুত্ব ছিল বলে ঐতিহাসিকরা বলেন।
প্রজাদের সুবিধার জন্য বহু শতাব্দী আগে পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম বিখ্যাত রাজা মহিপাল (অনেকে মহিপালকে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলেন) সাগরদিঘিতে বহু বড় বড় দিঘি খনন করেছিলেন। অনেকেই বলেন সাগরের মত আকারের দিঘি খনন করার জন্য এলাকার নাম হয়েছিল সাগরদিঘি।
সাগরদিঘিতে একাধিক দিঘি রয়েছে যার কোনও কোনওটি লম্বা এবং চওড়ায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার। অনেক ঐতিহাসিক জানান, সাগরদিঘির বিভিন্ন এলাকায় এখনও মাটি খুঁড়লে মাঝে মধ্যে পুরনো বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেই সাগরদিঘিতেই রাজা মহিপালের খনন করা একটি শতাব্দী প্রাচীন দিঘি বেআইনিভাবে ভরাট করে সেখানে বহুতল নির্মাণ করার চেষ্টার অভিযোগ উঠল কিছু জমি মাফিয়ার বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা এলাকায়।
মহিপালের তৈরি করা দিঘি বেআইনিভাবে ভরাট করার অভিযোগ পেয়ে শনিবার সকালে সাগরদিঘি থানার পুলিশ গিয়ে ওই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। সাগরদিঘির তৃণমূল বিধায়ক বাইরণ বিশ্বাস বলেন, "কোনও বেআইনি কাজ আমাদের দল বরদাস্ত করে না।"
স্থানীয় সূত্র জানা গিয়েছে, সাগরদিঘি এবং মোড়গ্রাম স্টেশনের খুব কাছেই রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন তিলানদিঘি (মতান্তরে তেলাংদিঘি)। অভিযোগ উঠেছে শতাব্দী প্রাচীন এই দিঘির কিছুটা জায়গা জমি মাফিয়ারা প্রকাশ্যে দিনের বেলাতেই মাটি ফেলে ভরাট করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ওই দিঘির ভরাট হওয়া একাংশে নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাগরদিঘির বাসিন্দা অমূল্য ঘোষ নামের এক ব্যক্তি বলেন, "রাজা মহিপালের আমলে সাগরদিঘিতে বেশ কিছু বড় দিঘি খনন করা হয়েছিল এলাকাবাসীর যাতে পানীয় জলের কোন সমস্যা না হয় এবং কৃষকরা যাতে শুখা মরশুমে চাষের জমিতে জল পান সেই কারণে এই দিঘিগুলো রাজারা খনন করেছিলেন।" তাঁর কথায়, "সম্প্রতি আমাদের নজরে এসেছে তেলানদিঘির একটি বড় অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে বহুতল নির্মাণের কাজ শুরু করেছে কিছু জমি মাফিয়া।"
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তেলানদিঘি ভরাট হতে দেখে কিছু বাসিন্দা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগ পাওয়ার পর কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ফের নতুন করে রাজা মহিপালের সময়ে তৈরি হওয়া তেলানদিঘি ভরাট করার কাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ।
গ্রামবাসীরা জানান, যে এলাকায় নির্মাণ কাজ হচ্ছে তার ঠিক সামনে রয়েছে জেলা পরিষদের বড় রাস্তা। তারপরেই রয়েছে রেল লাইন। যার এক প্রান্তে রয়েছে সাগরদিঘি স্টেশন অন্যপ্রান্তে মোড়গ্রাম স্টেশন। ফলে ওই এলাকায় জমির দাম বেড়েই চলেছে। এই কারণে জমি মাফিয়ারা কারও তোয়াক্কা না করে দিনের বেলাতেও মাটি ফেলে তেলানদিঘি ভরাট করে নির্মাণ কাজ করছে বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, যেভাবে প্রকাশ্যে তেলানদিঘি ভরাট হয়ে যাচ্ছে তার ফলে এলাকার বাস্তুতন্ত্র প্রচণ্ড ক্ষতি হবে। এছাড়াও বর্ষাকালে বৃষ্টির জল নামার জায়গা পাবে না। ফলে প্লাবিত হতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা।
পুলিশের চেষ্টায় শনিবার থেকে তেলানদিঘি ভরাট বন্ধ হওয়ায় কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন গ্রামবাসীরা। যদিও তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে ফের একবার জমি মাফিয়ারা রাজা মহিপালের তৈরি করা এই দিঘি ভরাট করে ফেলবে।
