আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'যে টেলিফোন আসার কথা, সচরাচর তা আসে না।' পূর্ণেন্দু পত্রীর লাইনটাকেই যেন কিছুটা ঘুরিয়ে বলতে চাইছে রাজ্যের শাসক দল। টেলিফোনকে আর একটু পিছিয়ে গিয়ে, চিঠির রূপক দেওয়া। আচমকা রাজ্যের শাসক দলের পদক্ষেপের সঙ্গে, কবিতাকে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন? কারণ, বৃহস্পতিবার রাজ্যের শাসক দল সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেছে। নীচে একপাতা লম্বা চিঠি। ক্যাপশনে লেখা, 'এটা সেই চিঠি, যেতা নরেন্দ্র মোদি আপনাদের কখনও পাঠাবেন না।'
প্রধানমন্ত্রীর চিঠি প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দিনকয়েক আগেই, দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলার মানুষদের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে, পশ্চিমবঙ্গকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ২০২৬-এই বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ' গড়ার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, 'আর মাত্র কয়েক মাস, তারপরেই নির্ধারিত হবে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোন পথে চালিত হবে, তার গুরুদায়িত্ব নির্ভর করছে আপনার একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের উপর। আমার স্বপ্নের সোনার বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা আজ চরম বঞ্চনার শিকার। তাঁদের যন্ত্রণায় আমার হৃদয়ও আজ ভারাক্রান্ত। তাই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমি একটিই সংকল্প গ্রহণ করেছি, পশ্চিমবঙ্গকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করে তোলার সংকল্প।'
এবার পালটা ময়দানে তৃণমূল কংগ্রেস। পয়েন্ট ধরে ধরে তারা বলতে চেয়েছে, কোন কোন বিষয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথা বলা উচিৎ ছিল বাংলার মানুষের সামনে। উঠল বঙ্কিমচন্দ্র প্রসঙ্গ, রইল এসআইআর ইস্যু। চিঠির শেষাংশে লেখা, 'বিকশিত ভারত' গড়তে না পারা একজন স্বঘোষিত ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, আমি আপনাদের মাটিতে পা রাখব, "বিকশিত বাংলা"-র ফাঁপা বুলি আওড়াব এবং আপনাদের সমর্থনের জন্য ভিক্ষে চাইব।'
?s=48
ঠিক কী লেখা রয়েছে চিঠিতে-
'বাংলার মানুষের কাছে আমার অকপট স্বীকারোক্তি
আমি শুরু করছি বহু প্রতীক্ষিত স্বীকারোক্তি দিয়ে: আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমি বারবার দাবি করেছিলাম যে, বাংলায় দুর্গাপুজো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখন আর কোনও পথ না থাকায়, আমাকে 'জয় মা কালী' স্লোগান তুলে লোকদেখানো ভক্তি প্রদর্শনের অভিনয় করতে হচ্ছে। আমি বাংলার সেই সুগভীর সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রশংসা করার ভান করছি, যা সত্যি বলতে আমি কখনই বুঝে উঠতে পারিনি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই মহান রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। আগামী প্রজন্ম কোন পথে হাঁটবে, তা নির্ভর করছে আপনাদের বিচক্ষণ ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের উপর। তাই আমি বাধ্য হয়েই একগুচ্ছ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে নিজের আসল রূপ সকলের সামনে তুলে ধরছি।
প্রথমেই স্বীকার করছি, বাংলার উন্নয়নের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজ্যের প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় তহবিল আটকে দিয়েছি। MGNREGA (যে নামটা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যুক্ত বলে আমার কাছে আরও অস্বস্তিকর), আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক যোজনা এবং জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পের টাকা আমি দিইনি। এর মাধ্যমে আমি নিষ্ঠুরভাবে শ্রমিকদের মজুরি, পরিবারগুলোর মাথার উপরের ছাদ, গ্রামের রাস্তা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিশ্রুত পানীয় জল কেড়ে নিয়েছি। এগুলো আসলে আমারই পরিকল্পিত বঞ্চনা, যা বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
এটাও স্বীকার করছি, আমার নীতিগুলো সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। আমি সেইসব মহিলাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, যাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে, সেইসব কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেছি, যাদের ভবিষ্যৎ আমি বিদেশি শক্তির কাছে বন্ধক দিয়েছি, কর্মসংস্থানহীন যুবসমাজ এবং আমার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হওয়া প্রান্তিক মানুষের সাথেও আমি প্রতারণা করেছি। কিন্তু বাংলা এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম; আপনাদের 'স্বনির্ভর বাংলা' আমার মনে তীব্র ক্ষোভ ও হিংসার জন্ম দেয়। আর কোনও উপায় না পেয়ে, আমি আমার দলের শাসন চলা রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের নিশানা করা শুরু করেছি। বাঙালি ও বাংলাদেশির মধ্যে থাক| পার্থক্যকে সচেতনভাবে মুছে দিয়ে, মাতৃভাষার ভিত্তিতে মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে এবং তাদের আটক, দেশান্তর ও শারীরিক নির্যাতন করেছি, এমনকি মৃত্যুর পথেও ঠেলে দিয়েছি।
এই অবজ্ঞা আসলে আপনাদের রাজ্য সম্পর্কে আমার চরম অজ্ঞতা থেকে এসেছে। আমি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অত্যন্ত হালকাভাবে "বঙ্কিম দা" বলে সম্বোধন করার মতো ভুল করেছি। আমার দল স্বামী বিবেকানন্দকে "অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট" বলে অপমান করেছে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর করেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গায়ের রং নিয়ে উপহাস করেছে এবং 'জনগণমন'কে ব্রিটিশদের স্বাগত জানানোর গান বলে বিদ্রুপ করেছে। আমরা স্বাধীনতা দিবসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামাঙ্কিত ট্যাবলো বাতিল করেছি, মা সারদাদেবীর অবমাননাকর ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়েছি, এমনকি মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছি।
এই সব অপমানেও যখন বাংলার মনোবল ভাঙা গেল না, তখন আমি বাঙালিদের "ঘুষপেটিয়া" বলে দেগে দেওয়ার পথ বেছে নিলাম। আমরা অক্লান্তভাবে এই মিথ্যে প্রচার করেছি যে, আপনাদের রাজ্য অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্য; আসলে পহেলগাঁও হামলা বা দিল্লির ভয়াবহ বিস্ফোরণের মতো ট্র্যাজেডিগুলো ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিক থেকে নজর ঘোরানোর জন্য এসব করা হয়েছে।
এত কিছুর পরেও আমাদের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণই থাকল। আর তাই আমরা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের চিরাচরিত আচরণ বজায় রেখে নির্বাচন কমিশনকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলাম। বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিতে এবং নির্বাচনের ফলাফল আমাদের পক্ষে আনতে আমরা বাংলার উপর তড়িঘড়ি 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) চাপিয়ে দিলাম। এই প্রক্রিয়ার ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ১৬০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, তা সত্ত্বেও আমি এর কোনও দায়ভার গ্রহণ করিনি ।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিভেদমূলক, বৈষম্যমূলক এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার পরেও আমি আপনাদের কাছে নির্লজ্জের মতো ভোট চাইছি। যদি আপনারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেন, তবে আমার সেই স্লোগান "বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই" মনে রাখবেন। যার মূল অর্থ হল- আপনাদের বেঁচে থাকাটাই আমাদের উপর নির্ভর করছে। আমার অবাধ্য হলে আপনাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে নানা বিধিনিষেধ, যেমন মাছ ও মাংস খাওয়ার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা; ঠিক যেমনটা আমরা আমাদের "পাল্টানো দরকার" প্রচারে আভাস দিয়েছি। এক দশকেরও বেশি সময়ে "বিকশিত ভারত" গড়তে না পারা একজন স্বঘোষিত ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, আমি আপনাদের মাটিতে পা রাখব, "বিকশিত বাংলা"-র ফাঁপা বুলি আওড়াব এবং আপনাদের সমর্থনের জন্য ভিক্ষে চাইব।'
