আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানায় সরকারি আবাস প্রকল্পে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য। প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে উপভোক্তাদের টাকা ফেরৎ দিলেন খোদ তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্য। শুধু টাকা ফেরৎ দেওয়াই নয়, এই ঘটনায় নিজের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিস্ফোরক মন্তব্যও করেন তিনি। আর সেই মন্তব্যকে ঘিরেই এলাকায় রাজনৈতিক তরজা তীব্র হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে নামখানার শিবরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাতিবুনিয়া এলাকায়। অভিযুক্ত মাধবচন্দ্র লায়া, যিনি শিবরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৫২ নম্বর বুথের সদস্য। অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা বা সরকারি আবাস প্রকল্পের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে এলাকার বহু উপভোক্তার কাছ থেকে মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ জমেছিল।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় ৪৫ জন উপভোক্তার কাছ থেকে এই টাকা তোলা হয়েছিল। অভিযোগ, সরকারি ঘরের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া হয়। অনেকেই অভিযোগ করলেও দীর্ঘদিন বিষয়টি চাপা ছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে গ্রামে এই নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

রবিবার পাতিবুনিয়ার একটি স্কুল মাঠে স্থানীয় গ্রামবাসী, বিজেপি নেতৃত্ব এবং এলাকার বহু মানুষের উপস্থিতিতে একটি সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত হন মাধবচন্দ্র লায়া। সভার মাঝেই তিনি প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের হাতে একে একে টাকা তুলে দেন। স্থানীয়দের দাবি, মোট ৪৫ জন উপভোক্তাকে মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা করে ফেরৎ দেওয়া হয়েছে।

এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমে যায় এলাকায়। প্রকাশ্যে এক জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এভাবে টাকা ফেরৎ দেওয়ার ঘটনা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ একে ‘ভয়ের রাজনীতি বদলের প্রভাব’ বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন রাজনৈতিক চাপের ফলেই এই পদক্ষেপ।

টাকা ফেরতের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্ফোরক দাবি করেন মাধবচন্দ্র লায়া। তিনি বলেন, “ঘরের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে আমি টাকা নিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু আমাকে দলের পক্ষ থেকে এই টাকা তোলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই টাকা পঞ্চায়েতের টেবিলে জমা দিয়েছিলাম। নিজের জন্য এক টাকাও নিইনি।”

এরপর আরও বড় অভিযোগ করেন তিনি। দাবি করেন, "এই কাটমানি কাণ্ডে স্থানীয় স্তরেই নয়, তৃণমূলের উচ্চপদস্থ নেতৃত্বও জড়িত। তাঁর কথায়,“এই দুর্নীতির সঙ্গে শিবরামপুর পঞ্চায়েত ও তৃণমূলের উপরের নেতৃত্ব জড়িত। আমি যদি সব নাম প্রকাশ করি, তাহলে আমাকে এবং আমার বৃদ্ধ বাবাকে খুন করা হতে পারে।”

মাধবচন্দ্রের এই মন্তব্য ঘিরে এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও তাঁর এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও প্রশাসনিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের তরফেও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছে বিজেপি। মথুরাপুর বিজেপি সাংগঠনিক জেলার সম্পাদক বিপ্লব নায়েক বলেন, “ওই ব্যক্তি নিজের দোষ স্বীকার করেছে এবং মানুষের টাকা ফেরৎ দিচ্ছে। কিন্তু সে এটাও বলেছে যে নিজের জন্য নয়, উপরের নেতাদের জন্য টাকা তুলেছিল। আমরা চাই, গরিব মানুষের কাছ থেকে যারা এইভাবে টাকা নিয়েছে, তারা যেন সব ফেরৎ দেয়। প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আনা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাব।”

অন্যদিকে, গ্রামবাসীদের একাংশ জানিয়েছেন, সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতে টাকা দেওয়াটা যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা শ্যামলী প্রধান বলেন, “আমাদের সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। তখন কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হতো। পরে পঞ্চায়েত সদস্য বাড়িতে এসে বলেন যে নেওয়া টাকা ফেরৎ দেওয়া হবে। সেই মতো সভায় গিয়ে আমরা টাকা ফেরত পেয়েছি।”

যদিও এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। প্রশাসনের তরফেও আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রকাশ্যে টাকা ফেরৎ দেওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগে দলের উচ্চস্তরের নাম উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় অতীতের একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। নামখানার এই ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিল। এখন দেখার, প্রশাসন এই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করে কি না, এবং মাধবচন্দ্র লায়ার অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকৃতপক্ষে কারও বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিনা।