আজকাল ওয়েবডেস্ক: দোকানটি দেখতে পাড়ার অন্য যেকোনও সাধারণ মিষ্টির দোকানের মতোই। সাধারণ রং করা দেওয়াল, ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ করা সিলিং ফ্যান, ক্রেতাদের বসার জন্য সাধারণ কাঠের বেঞ্চ, কাজে মগ্ন নীরব কারিগর আর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিতে ঠাসা বড় কাঁচের শো-কেস।

তবুও, এই দোকান গেলে একটা বিষয় দেখে আনেক ক্রেতাই থমকে যান। তা হল দোকানের সাইনবোর্ড! সেখানে লেখা ‘ঘোষাল অ্যান্ড ডটার’। এই সাইনবোর্ড দেখে অনেরকেই ভাবেন যে, ‘ঘোষাল’ নিশ্চয়ই একজন বাবা, যিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে মিলে ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং মেয়েটিই একদিন সেই ব্যবসার উত্তরাধিকারী।

কৌতূহলের বসে খোঁজখবর করতেই জানা গেল, ঘোষাল আসলে কোনও পুরুষ নন। এই মিষ্টির দোকানের কর্ণধার সুতপা ঘোষাল! ২০১৮ সালে তিনি এই ব্যবসা করছেন। ভবিষ্যতে তাঁর মেয়ে মোমোইরো মুখার্জির হাতেই তিনি ব্যবসার দায়িত্ব তুলে দেবেন।

‘ঘোষাল অ্যান্ড ডটার’ নিষ্টির দোকান হাওড়ার নেতাজি সুভাষ রোডের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। মানুষকে সদ্য তৈরি মিষ্টির স্বাদ দেওয়া, সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই ছোট্ট মিষ্টির দোকান খোলা হয়েছিল। দূরদর্শনের প্রাক্তন ঘোষক ও টেলিভিশন সঞ্চালক সুতপা ঘোষাল এই দোকানের মালিক। তাঁর মতে, কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতায় সমাজে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা সত্ত্বেও, সমাজের সেই প্রথাগত মানসিকতা তাঁকে আজও ভাবিয়ে তোলে। সুতপা বলেন, “সমাজ প্রথাগত রীতিনীতি কাটিয়ে উঠেছে বলে যতই দাবি করা হোক না কেন, মহিলারা আজও পিতৃতন্ত্রের নীরব দৃষ্টির শিকার হন। তাই এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা আমার জন্য এক বাড়তি চ্যালেঞ্জ।”

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলায় পিএইচডি ডিগ্রিধারী সুতপা ঘোষাল নিজের ব্যবসা শুরু করার আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিষয়েও পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, “পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার না পেয়ে মিষ্টির জগতে একক উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হল দক্ষ মিষ্টি কারিগর খুঁজে পাওয়া। নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবতাটা বেশ কঠিন। আমি সাধারণত নদীয়া ও হাওড়া থেকে কর্মী নিয়োগ করি, কিন্তু সত্যি বলতে, সব সময় একই মানের মিষ্টি তৈরি করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়।” 

আদপে, সুতপা ঘোষালের পথচলা কখনওই খুব একটা মসৃণ ছিল না। তবুও তিনি তাঁর গ্রাহকদের নিয়ে অত্যন্ত খুশি, যাঁরা তাঁর তৈরি মিষ্টির কদর করেন এবং বিশেষ করে কালাকাঁদ ও মিল্ক কেকের টানে বারবার তাঁর দোকানে ফিরে আসেন।

সুতপা আরও জানান যে, হাওড়ার প্রাণকেন্দ্রে একটি মিষ্টির দোকান খোলার ব্যাপারে তাঁর মেয়েই তাঁকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি বলেন, “এই পুরো যাত্রাপথে আমার মেয়েই ছিল আমার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।”

যে দেশে পারিবারিক ব্যবসার বিষয়টি প্রথাগতভাবে বাবা, ভাই কিংবা ছেলেদের সঙ্গেই যুক্ত, সেখানে ‘ঘোষাল অ্যান্ড ডটার’ এক ভিন্ন ধারার গল্প তুলে ধরে। সুতপা ঘোষালের কাছে এই সাইনবোর্ডটি কেবল তাঁর মিষ্টির দোকানের নাম নয়, সেটি হল এক নীরব ঘোষণা। যা বলছে- ব্যবসা, উত্তরাধিকার এবং স্বপ্ন- এসবই মায়ের কাছ থেকে মেয়ের কাছে একই ধারায় স্বাভাবিকভাবেই হস্তান্তরিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র- দ্য টেলিগ্রাফ