আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড় নিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত মুখপাত্র ঋজু দত্ত। সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের পর নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দরাজ প্রশংসা করে তিনি কার্যত হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছেন। ঋজুর দাবি, ভোটের ফল প্রকাশের পর শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহকারীর খুনের ঘটনায় রাজ্য যখন উত্তপ্ত, তখন শুভেন্দুর সংযত ভূমিকার কারণেই অন্তত ৫,০০০ তৃণমূল কর্মীর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। তৃণমূল থেকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কৃত এই নেতার মুখে বিজেপি থেকে আসা মুখ্যমন্ত্রীর এমন স্তুতি শাসক শিবিরের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংবাদসংস্থা এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঋজু দত্ত বলেন, “গত ৬ মে শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ককে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। সেদিন রাতে শুভেন্দু যদি প্রতিশোধের ডাক দিতেন, তবে সারা বাংলায় অন্তত ৫,০০০ তৃণমূল কর্মী মারা যেতেন। কিন্তু তিনি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে বলেছিলেন।” এখানেই থেমে থাকেননি ঋজু; তিনি স্পষ্ট জানান যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য সবথেকে যোগ্য ব্যক্তি শুভেন্দু অধিকারীই। তার মতে, সাংসদ, ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং নন্দীগ্রামে মমতা ব্যানার্জিকে হারানোর যে রেকর্ড শুভেন্দুর ঝুলিতে আছে, তা ভারতের প্রথম সারির রাজনীতিবিদদের তালিকায় তাকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

দলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়ে ঋজু দত্ত সরাসরি নিশানা করেছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। বিশেষ করে নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই-প্যাক’-এর (I-PAC) ওপর অতি-নির্ভরতা নিয়ে তিনি মমতা ও অভিষেক ব্যানার্জিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তার অভিযোগ, একটি বাইরের সংস্থা পুরো দলটাকে কব্জা করে নিয়েছে এবং দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে। নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে তৃণমূলের অন্দরে যে বিদ্রোহের সুর দানা বাঁধছিল, ঋজুর এই বয়ান তাকে আরও উসকে দিল।

প্রসঙ্গত, ঋজু দত্ত একাই নন, দলের পরাজয়ের পর থেকে একাধিক নেতা প্রকাশ্যেই সরব হয়েছেন। প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি থেকে শুরু করে কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ বা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীর মতো প্রবীণ নেতারাও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে অভিষেক ব্যানার্জির  রাজনৈতিক পরিচালনার ধরণ এবং দুর্নীতি নিয়ে দলের অন্দরেই কানাঘুষো চলছিল। রত্না চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রার্থীরাও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাতে না পারার অভিযোগ তুলেছেন।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই সমস্ত মন্তব্যকে পাত্তাই দিতে চাইছে না। দলের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে কেউ কোনও  মন্তব্য করলে তার দায় দলের নয়। বহিষ্কৃত নেতার বক্তব্যকে ‘ব্যক্তিগত মতামত’ হিসেবে দেগে দিয়ে তৃণমূল হাইকম্যান্ড নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঋজু দত্তর এই ‘শুভেন্দু-বন্দনা’ আসলে ভাঙনের মুখে থাকা একটি দলের অন্দরের গভীর ক্ষতকেই জনসমক্ষে নিয়ে এল। সংবাদ প্রতিবেদন হিসেবে এই ঘটনা এখন বাংলার রাজনীতির অলিন্দে সবথেকে আলোচিত বিষয়।